Apr 5, 2015

সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন : কিছু প্রশ্ন ও উদ্বেগ

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৮ এপ্রিল এ দুটি সিটির সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনও। আমি মনে করি, এই নির্বাচন ঢাকা ও চট্টগ্রামবাসীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা সিটি কর্পোরেশন দুটিতে নির্বাচন না হওয়ায় এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিকরা বিভিন্ন সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে শিগগির চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে এবং জুলাই মাসের মধ্যেই এ নির্বাচন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসি) সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০২ সালের এপ্রিলে। ২০০৭ সালের ১৫ মে মেয়াদ শেষ হলেও বিগত কোনো সরকারই ডিসিসির নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়নি। মহাজোট সরকার ২০১১ সালের ৩০ নভেম্বর ডিসিসিকে ভেঙে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বিভক্ত করে।
এরপর ২০১২ সালের ২৪ মে ওই দুই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হয়। সে সময় দায়ের করা একটি রিটের প্রেক্ষিতে নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেন মহামান্য হাইকোর্ট। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালের ১৩ মে উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি সরকার। পরে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯-এ নতুন বা বিভক্ত সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে প্রশাসক নিয়োগের বিধান করা হয়। আইনে প্রশাসকের মেয়াদকাল ছয় মাস নির্ধারণ করে দেয়া হলেও দুই বছরের বেশি সময় ধরে প্রশাসক দিয়েই চলছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। প্রসঙ্গত, ‘কুদরত-ই-ইলাহী বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায়ে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, যদি সরকারি কর্মকর্তা বা তাদের তল্পিবহদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য নিযুক্ত করা হয়, তাহলে এগুলোকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা যুক্তিযুক্ত নয়।

আশার কথা যে, দীর্ঘদিন পর হলেও ঢাকার দুই সিটিতে এবং নির্ধারিত সময়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা এ নির্বাচনকে স্বাগত জানাই। আশা করি, তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে, যার মধ্য দিয়ে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। স্বাগত জানালেও এ নির্বাচন নিয়ে আমাদের মনে কিছু প্রশ্ন রয়েছে। রয়েছে কিছু উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।

আমাদের প্রথম প্রশ্নটি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড সংখ্যা নিয়ে। নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ভোটার সংখ্যা ২৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৩ এবং ঢাকা দক্ষিণের ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৬৩। অন্যদিকে ঢাকা উত্তরের ওয়ার্ড সংখ্যা ৩৬টি এবং ঢাকা দক্ষিণের ওয়ার্ড সংখ্যা ৫৭টি। ঢাকা উত্তরের ভোটার সংখ্যা দক্ষিণের চেয়ে প্রায় পাঁচ লাখ বেশি হলেও দক্ষিণের ওয়ার্ড সংখ্যা ২১টি বেশি। ভোটার সংখ্যার সঙ্গে ওয়ার্ড সংখ্যার এ বিরাট অসঙ্গতি কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।

আরেকটি অসঙ্গতি হল ঢাকার দুই সিটিতে ওয়ার্ডভিত্তিক ভোটার সংখ্যায় ব্যাপক তারতম্য। উদাহরণস্বরূপ, গত ২৮ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের (পল্লবী) ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজার ৫৩৬। পক্ষান্তরে একই সিটির ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের (মোহাম্মদপুর) ভোটার মাত্র ৩১ হাজার ৭৭৭ জন। একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ধানমণ্ডি থানাধীন ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার সংখ্যা ৭৫ হাজার ১৭৫ হলেও কোতোয়ালি থানাধীন ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার সংখ্যা মাত্র ১২ হাজার ৯৬ (সমকাল, ১৮ মার্চ ২০১৫)।

নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণত তিনটি মানদণ্ড- প্রশাসনিক সুবিধা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং ভোটার সংখ্যা- ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শহরাঞ্চলে সাধারণত প্রশাসনিক সুবিধা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতায় তারতম্য থাকে না, তাই ভোটার সংখ্যায় যথাসম্ভব সমতাই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। মোট ভোটার সংখ্যা, ওয়ার্ড সংখ্যা ও ওয়ার্ডভিত্তিক ভোটার সংখ্যার সঙ্গে প্রতিনিধিত্বশীলতার প্রশ্ন জড়িত। আর গণতন্ত্রের মূলকথাই হল প্রতিনিধিত্বশীলতা। তাই কোন যুক্তিতে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড সংখ্যা নির্ধারণ এবং ওয়ার্ডের সীমানা পুনঃনির্ধারণের ক্ষেত্রে ভোটারদের সমপ্রতিনিধিত্বের বিষয়টি উপেক্ষা করে এ তুঘলকি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।

বর্তমানে সারা দেশে পেট্রলবোমা হামলা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নানা ধরনের সহিংসতা ঘটছে। মূলত ৫ জানুয়ারির পর থেকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ২০ দলীয় জোটের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে সরকার এ আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে ক্রমাগতভাবে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে, বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের নামে বহু মামলা দায়ের করেছে, লাখ লাখ ব্যক্তিকে আসামি করেছে এবং অনেককেই গ্রেফতার করেছে। এর ফলে অনেক সম্ভাব্য প্রার্থীই মামলার কারণে কারারুদ্ধ বা পলাতক রয়েছেন। এ অবস্থায় সম্ভাব্য সব প্রার্থীর অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ সৃষ্টি তথা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আমরা নির্বাচন কমিশনের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় নির্বাচন এবং এসব নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের কোনো সুযোগ নেই। তা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ আরও অনেক দলই ইতিমধ্যে তাদের মেয়র পদপ্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে। তারা অনেক সম্ভাব্য প্রার্থীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে বিরত রাখছে। নিঃসন্দেহে এর মাধ্যমে প্রচলিত বিধি-বিধানকেই শুধু উপেক্ষা করা হচ্ছে না, রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করারও চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, নির্দলীয় নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং ভোটারদের জন্য অনেক বেশি ‘চয়েস’ থাকে। ফলে তাদের পক্ষে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়ার বেশি সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগত মানে পরিবর্তন সাধনে সহায়তা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।

বিদ্যমান সিটি কর্পোরেশন (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালার ৪ ধারা অনুযায়ী, ‘কোনো প্রার্থী বা তাহার পক্ষ হইতে অন্য কোনো ব্যক্তি ভোট গ্রহণের জন্য নির্ধারিত তারিখের ২১ দিন পূর্বে কোনো প্রকার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করিতে পারিবেন না।’ কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি যে, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই এবং ভোট গ্রহণের ২১ দিন আগেই সম্ভাব্য অনেক প্রার্থীর পক্ষ থেকে চট্টগ্রামসহ তিন সিটিতেই অসংখ্য বিলবোর্ড স্থাপন ও দেয়ালে পোস্টার সাঁটার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়েছে, যা আচরণবিধির সুস্পষ্ট লংঘন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ ধরনের প্রচারণার সুযোগে ধনাঢ্য প্রার্থীরা নির্ধারিত ব্যয়সীমার বাইরে ভোটারদের প্রভাবিত করার লক্ষ্যে ব্যাপক পরিমাণে অর্থ ব্যয় করতে পারেন, যা নির্বাচনী ক্ষেত্রকে অসমতল করে তোলে। দুর্ভাগ্যবশত এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন অনেকটাই নীরব ভূমিকা পালন করছে।

নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক পন্থা, যার মাধ্যমে ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারেন। তাই নির্বাচন বহু মতের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করার মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলে সহায়তা করে। কিন্তু সে নির্বাচন যদি অযাচিতভাবে রাজনৈতিক দল ও টাকার দ্বারা প্রভাবিত হয় তাহলে নির্বাচনী ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। এমন নির্বাচন সমস্যার সমাধান না করে নতুন করে সমস্যারই সৃষ্টি করে। তাই আসন্ন তিনটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষা।

আমাদের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ এ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলা এবং সর্বস্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের প্রত্যাশা- সবার অংশগ্রহণে এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তফসিল ঘোষিত হওয়া তিনটি সিটি কর্পোরেশনে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই প্রত্যাশার কথা বিবেচনায় রেখে সরকারের প্রতি আহ্বান- সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করুন।

নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান- অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং প্রার্থীরা যাতে নির্বাচনী আচরণবিধি যথাযথভাবে মেনে চলেন, সে ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা পালন করুন। প্রার্থী কর্তৃক দাখিলকৃত হলফনামা ও আয়কর রিটার্ন যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখুন। কারণ ইতিমধ্যে দাখিলকৃত বেশ কয়েকজন প্রার্থী তাদের হলফনামায় সম্পদের বিবরণসহ যেসব তথ্য দিয়েছেন সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে (বিবিসি বাংলা, ১ এপ্রিল ২০১৫)। কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করুন। প্রয়োজনে নির্বাচনের আগেই সেনাবাহিনী মোতায়েন করুন।

পরিশেষে, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান বা এক্সিট ওয়ে নয়। কেননা এটি একটি নির্দলীয় নির্বাচন। দেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক সংকট চলছে তা জাতীয় নির্বাচন নিয়ে। তাই এ সংকট সমাধানের লক্ষ্যে যত দ্রুত সম্ভব সব স্বার্থসংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি সংলাপের আয়োজন করা জরুরি, যার মাধ্যমে কতগুলো বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে উঠবে, একটি ‘জাতীয় সনদ’ প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করবে। 

তথ্যসূত্র: যুগান্তর, ০৬ এপ্রিল, ২০১৫
০৬ এপ্রিল, ২০১৫
০৬ এপ্রিল, ২০১৫
http://www.jugantor.com/sub-editorial/2015/04/06/245495

No comments:

Post a Comment