Feb 7, 2015

এই অশুভ প্রতিযোগিতার অবসান জরুরি

ছবি: আমাদের বুধবার ডটকম
আমাদের দুটি প্রধান দল -আওয়ামী লীগ ও বিএনপি - যেন এক ভয়াবহ অশুভ প্রতিযেগিতায় লিপ্ত হয়েছে। কোন দল কত কঠোর, হঠকারি ও নিষ্ঠুর হতে পারে এটি তারই প্রতিযোগিতা। গত শুক্রবার বিএনপির পক্ষ থেকে এসএসসি পরীক্ষার সময় হরতাল ডাকা হয়েছে, যা পরবর্তীতে অযৌক্তিকভাবে আবার বাড়ানো হয় এবং একাধিকবার পরীক্ষার তারিখ স্থগিত করতে হয়। ওই দিনই সরকারের একজন মাননীয় মন্ত্রী খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের, যেখানে তিনি গত তিন সপ্তাহের অধিককাল ধরে অবস্থান করছেন, পানি ও বিদ্যুৎ, এমনকি খাবার সরবরাহ বন্ধ করার হুমকি দেন। আরেকজন মন্ত্রী তাঁকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুমিয়ে রাখার হুমকি দেন। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই বেগম জিয়ার কার্যালয় থেকে বিদ্যুৎ, ডিসলাইন এবং ইন্টারনেট সংযোগ ছিন্ন করে দেওয়া হয়, যদিও প্রায় ১৯ ঘণ্টা পরে বিদ্যুৎ সংযোগ আবার পুনঃস্থাপন করা হয়। এরপর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে কাপুরুষোচিত পেট্রোল বোমা হামলায় সাতজন নিরাপরাধ মানুষকে পুড়িয়ে মারা এবং আরও অনেককে আহত করা হয়। এসব হুমকি ও অপরাধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গত কয়েক সপ্তাহের সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে, যে আন্দোলনে ৩ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত ৫৮ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে, এক নতুন অধ্যায় যুক্ত হলো (প্রথম আলো, ৪ ফেব্র“য়ারি, ২০১৫)। আর এসবই করা হয় জনগণের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার নামে। আমরা মনে করি যে, এ অশুভ প্রতিযোগিতার স্থায়ীভাবে অবসান জরুরি, কারণ এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কল্যাণ তো হবেই না বরং এতে তাদের চরম স্বার্থহানি ঘটবে।


এ প্রসঙ্গে ছোটবেলায় পড়া একটি গল্পের কথা মনে পড়ে। একদল শিশু খেলাচ্ছলে একটি ডোবায় ঢিল ছুড়ছিলো। সে ডোবায় অনেকগুলো ব্যাঙ বাস করতো, ঢিলের আঘাতে যারা ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছিলো। কিছুক্ষণ পর একটি বয়ষ্ক ব্যাঙ বলে উঠলো- তোমাদের জন্য যেটা খেলা, আমাদের জন্য সেটা নির্ঘাত মৃত্যু। তেমনিভাবে আমাদের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের জন্য যেটা ক্ষমতার খেলা, বাংলাদেশের মানুষের জন্য সেটা এক চরম অশনিসঙ্কেত। কারণ এমন অশুভ প্রতিযোগিতা চলতে থাকলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে শাসনের অযোগ্য হয়ে যেতে এবং আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। এমনকি আমরা গৃহযুদ্ধের দিকেও ধাবিত হতে পারি, যা সাধারণ জনগণের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে বাধ্য।

আমরা মনে করি যে, অনাকাক্সিক্ষত কঠোরতা ও অযৌক্তিকতা দল দুটির অন্তর্নিহিত দুর্বলতারই প্রতিফলন। যুক্তিতে দুর্বল হলে মানুষ যেমন উচ্চকণ্ঠ হয়, তেমনি জনবিচ্ছিন্ন হলেও রাজনৈতিক দল অযৌক্তিক ও অনাকাক্সিক্ষত আচরণ করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০১-০৬ সালে ক্ষমতায় থাকাকালীন বিএনপি-জামায়াত দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন তথা তাদের কৃত অপকর্ম ও অপশাসনের জন্য চরমভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। আর এ জনবিচ্ছিন্নতার কারণেই তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে চরমভাবে বিতর্কিত এবং তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের প্রতি দমন-পীড়নমূলক আচরণ চালায়, যার চরম মাশুল অবশ্য তাদেরকে দিতে হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।

দিনবদলের অঙ্গীকার নিয়ে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ ও তার জোটভুক্তরা তাদের বহু ব্যর্থতা ও অপকর্মের কারণে ব্যাপকভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর এ জনবিচ্ছিন্নতার কারণে তারা পুরো তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাই বাতিল করে নির্বাচনী ‘খেলা’ শুরুর আগে একতরফাভাবে খেলার নিয়মই বদলে দেয় এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে, যেখানে ভোটারের উপস্থিতি ছিলো অতি নগন্য। ফলে ১৯৯১ সালের পর থেকে প্রথমবারের মত - ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছাড়া, যে নির্বাচনের ফলাফল টিকে থাকেনি - জনগণ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। আর আমাদের নির্বাচন সর্বস্ব ‘একদিনের গণতন্ত্র’ পরিণত হয় ভোটারবিহীন একধরনের প্রহসনে।

জনগণের সম্মতি ছাড়া ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সরকার বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতায় টিকে থাকার এবং গত ৩ জানুয়ারি থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে ইট-বালুর ট্রাক দিয়ে জনবিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। তার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির পক্ষ থেকে দেশব্যাপী হরতাল ও অবরোধের ডাক দেওয়া হয়, যা ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়। এরই ধারাবাহিকতাই সরকারের পক্ষ থেকে বেগম জিয়াকে বিভিন্ন নাগরিক সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই বিচ্ছিন্ন করার রাজনীতিতে লিপ্ত হয়ে ক্ষমতাসীনরা নিজেরাই যেন ক্রমাগতভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। হরতাল-অবরোধ, সহিংসতা এবং ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন নিয়ে হঠকারিতার জন্য বিএনপিও ইতোমধ্যে অনেক নাগরিকের সহানুভূতি হারিয়েছে।

অনেকেই বলবেন যে, জনবিচ্ছিন্ন হলেও আওয়ামী লীগ আর বিএনপিই আমাদের দেশে এখনও সবচেয়ে বড় দল। একথা সত্য যে, আওয়ামী লীগ বিএনপির অনেক কর্মী-সমর্থক রয়েছে। তবে এদের অধিকাংশই একটি ফায়দার চেইনে বাঁধা এবং কতগুলো শ্লোগান ও প্রতীকের দ্বারা হিপনোটাইজড, তারা নীতি-আদর্শের দ্বারা আকৃষ্ট নন। কারণ আমাদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলে নীতি-আদর্শ বলে কিছু নেই বললেই চলে। ক্ষমতা এবং ক্ষমতায় গিয়ে বা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে নগদ নারায়ণ কামাই যেন তাদের জন্য রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার বড় আকর্ষণ। তাই অন্যায়ভাবে অর্জিত টাকা ও পেশিশক্তির মালিকরাই বহুলাংশে আজ আমাদের দুটি রাজনৈতিক দলের প্রাণশক্তি। নীতি-আদর্শ বা কর্মসূচি দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে যেসব নেতা-কর্মীরা অতীতে এ দুটি দলে যুক্ত হয়েছিলেন তাঁদের অনেকেই আজ সাইড লাইনে। আর যেসব দলনিরপেক্ষ ভোটারদের সমর্থনে তারা বারবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, তারাও দল দুটি থেকে বহুলাংশে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে আমাদের দুটি প্রধান দলই আজ ফায়দাপুষ্ট, শিষ্টাচার বিবর্জিত দল দাসদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। আর এ ধরনের জনবিচ্ছিন্নতার কারণেই তারা পরস্পরের প্রতি অযৌক্তিক আচরণ ও নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করছে, যার মাধ্যমে অবশ্য তারা একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার স্বপ্ন দেখছে। বাস্তবতা হলো যে, এ প্রচেষ্টায় তারা সফল হবে না, বরং এর মাধ্যমে তারা পুরো জাতিকে চরম সংকটের দিকে ঠেলে দিবে।

আমরা জানি না কী কারণে কিংবা কাদের সুপরামর্শে শেষ পর্যন্ত বেগম জিয়ার কার্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হঠকারি সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে এসেছে। তবে আমরা এতে কিছুটা উৎসাহিত হয়েছি, যদিও পরবর্তী ঘটনাবলীর কারণে এ উৎসাহ ধরে রাখা যায়নি। তবে এসব আশা-নিরাশার মধ্যেই আমাদেরকে বর্তমান জটিল অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পন্থা খুঁজে বের করতে হবে। তাই তবুও আমরা আশা করি যে, সরকার বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হাস্যাস্পদ হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করবে এবং সুস্পষ্ট অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত নন তাদেরকে কারাগার থেকে মুক্তি দেবে। তবে যারা সহিংস কার্যক্রম ও মানুষ হত্যায় লিপ্ত তাদেরকে সরকার নির্মোহভাবে খুঁজে বের করবে এবং কঠোর শাস্তি দেবে, কারণ তারা ভয়ঙ্কর অপরাধী। একইসঙ্গে বিরাজমান রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে সকল স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সংলাপে বসার একটি তারিখ ঘোষণা করবে, কারণ সংলাপ এবং সমঝোতাই একমাত্র গণতন্ত্রের ভাষা। সরকার সংলাপ আয়োজনে ব্যর্থ হলে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে এই উদ্যোগ নিতে হবে। অপরদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট তাদের হরতাল-অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করবে এবং প্রায় ১৫ লাখ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যত নিয়ে খেলা করার হঠকারি সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে। ফলে সবাই মিলে সংলাপে বসে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছার এবং চলমান সমস্যার একটি টেকসই সমাধানে উপনীত হবার পথ সুগম হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

পরিশেষে, আমরা শঙ্কিত যে, এ উভয় পক্ষের অনমনীয়তা ও অযৌক্তিকতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শাসনেরই অযোগ্য হয়ে পড়বে। আমরা এক চরম বিশৃঙ্খল জাতিতে পরিণত হতে পারি, যা আমাদেরকে এক অজানা গন্তব্যের দিকে ধাবিত করবে।


তথ্যসূত্র: এ লেখার আংশিক ৭ ডিসেম্বর ২০১৫ প্রথম আলোতে প্রকাশিত।

No comments:

Post a Comment