Jan 11, 2015

বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

আজ বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুর মাত্র ১০ দিন আগে ২০১৪ সালের প্রথম দিনে সমকালে 'দগ্ধ সমাজের পোড়া কপাল ছুঁয়ে যাক শান্তির সমীরণ' শিরোনামের নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন: 'আমাদের সংবিধানের ২৭, ৩২ ও ৪৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না এবং এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে এবং আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের প্রবেশ, তল্লাশি ও আটক হতে স্বীয় গৃহে নিরাপত্তা লাভে অধিকারী এবং বিধিবিধানের ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার থাকবে।' তিনি এ নিবন্ধে আরও লিখেছিলেন, 'গণআন্দোলনের নামে চোরাগোপ্তা হামলা, ঝটিকা বাহিনীর ঝাপ্টা আর পেট্রোল বোমার ধকল সহ্য করতে বাংলাদেশের মানুষকে অসম্ভব দুর্গতি পোহাতে হয়েছে। রাজনীতিতে নাকি সবই সম্ভব। আগামীতে আর যেন অসম্ভব কিছু না ঘটে এ জন্যই সৃষ্টিকর্তার কাছে আমাদের প্রার্থনা।'

তাঁর ওই লেখাটি পড়লে মনে হবে, ২০১৫ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে লেখা। অথচ তিনি নেই আমাদের মাঝে। কিন্তু যদি তাকে অনুসরণের কথা বলি তাহলে বলব যে তিনি খুব ভালোভাবেই রয়েছেন আমাদের মাঝে এবং লেখনীসহ অনেক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আমাদের প্রতিনিয়ত সচেতন করে চলেছেন।
বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান কোনো বড় মাপের রাজনীতিক ছিলেন না, বড় সেনাপতিও নন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তার তেমন পদচারণার কথা শুনিনি। কিন্তু তিনি ছিলেন বিশেষভাবে সম্মানিত। তার কথা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ গভীর মনোযোগ সহকারে শুনতেন এবং তার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। তার প্রতি অগাধ আস্থা ছিল সবার। তাকে সম্মানিত করতে পেরে আমরাই সম্মানিত বোধ করি।
তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই রেনেসাঁ। এক বহুমাত্রিক প্রতিভা। তিনি আমাদের বিচার বিভাগকে সমৃদ্ধ করেছেন। তার অনেক রায় আমাদের বিচার বিভাগের ভিত হিসেবে কাজ করছে। তিনি লিখেছেন বিচিত্র বিষয়ে। সব্যসাচী লেখক হিসেবে সহজেই গণ্য হবেন। এগুলোতে যেমন তার পাণ্ডিত্যের প্রকাশ রয়েছে, তেমনি আমরা দেখি প্রখর রসবোধ।
বহুধারায় বিস্তৃত কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন বিষয়ে স্পষ্ট উচ্চারণ তাকে জাতির বিবেকের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। তিনি ছিলেন আলোকবর্তিকা। দেশের ক্রান্তিলগ্নে তার কাছ থেকে আমরা পেয়েছি দিকনির্দেশনা। প্রয়োজনে প্রতিবাদী হয়েছেন। ২০০৯ সালে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে মহাজোট সরকার গঠনের পর দলবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকার প্রেক্ষাপটে তার নির্ভীক উচ্চারণ ছিল_ দেশ আজ বাজিগরদের দখলে। বাড়াবাড়ি একদম পছন্দ করতেন না। তিনি যখনই মনে করেছেন আমাদের সতর্ক করতে সচেষ্ট হয়েছেন। আপাতভাবে তাকে অত্যন্ত নির্বিরোধী ও নিরীহ প্রকৃতির মানুষ মনে হতো। কিন্তু এটা ছিল বাহ্যিক খোলস। প্রকৃতপক্ষে ভেতরে লুকায়িত থাকত এক অসমসাহসী মানুষ। যখনই দেশ ও জাতির প্রয়োজন পড়েছে, তখনই তার প্রকাশ ঘটাতে আমরা দেখেছি। স্মরণ করুন সেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্র সমাবেশের কথা। ছাত্রছাত্রীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল_ ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল হবে। আর এ সাহসী পদক্ষেপের প্রথম দলে ছিলেন বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনের কয়েক দিন আগের সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টার ঘটনাও আমরা স্মরণ করতে পারি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তিনি সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং তাতে দ্রুতই সাড়া মেলে। তার চারিত্রিক দৃঢ়তা বারবার আমাদের মুগ্ধ করে। পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে নয়, বরং বিবেক দ্বারা চালিত হতেন বলেই এমনটি সম্ভব হয়েছে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি তার স্নেহের পরশে ধন্য ছিলাম। সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজনের কাজে নানাভাবে তার দিকনির্দেশনা পেয়েছি। তিনি নাগরিক সমাজের এ ধরনের উদ্যোগ ও কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিতেন। আমরা জাতীয় ও উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা নিয়ে গ্রন্থ প্রকাশ করি। তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা সংক্রান্ত বইয়ের গ্রন্থের মুখবন্ধে বলেছিলেন_ এটি হচ্ছে তথ্যভাণ্ডার।
এখন আমরা ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা দেখছি। চারদিকে হানাহানি ও সংঘাত। বিশিষ্টজন হিসেবে স্বীকৃত যারা তাদের কেউ নীরব, কেউ পক্ষপাতদুষ্ট। এমন সময়ে জাতির বিবেক, বাতিঘর হিসেবে স্বীকৃত বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হবে, এটাই স্বাভাবিক। তার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। 

তথ্যসূত্র: সমকাল, ১১ জানুয়ারি, ২০১৫
http://www.samakal.net/2015/01/11/110919

1 comment:

  1. বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

    ReplyDelete