Sep 22, 2014

প্রস্তাবিত ষোড়শ সংশোধনী ও বিশেষজ্ঞ মতামত

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রস্তাবিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস করার সুপারিশ করেছে। এই সংশোধনীর ফলে বর্তমান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে’র বিধান বাতিল হয়ে যাবে এবং সংসদ উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা ফেরত পাবে। প্রস্তাবিত সংশোধনীটি নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’র অন্যতম সদস্য ও সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ২০১০ সালে গঠিত সংসদীয় ‘বিশেষ কমিটি’র কো-চেয়ারপারসন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১ সেপ্টেম্বর বলেছেন, সরকার জিয়াউর রহমানের ‘বিকলাঙ্গ’ করা সংবিধান ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছে (আমাদের সময়, সেপ্টেম্বর ২০১৪)। সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হক সরকারের উদ্যোগকে সমর্থন করে সম্প্রতি বলেছেন, বিচারকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য এই সংশোধনী প্রয়োজন।
পক্ষান্তরে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির আরেক অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম মনে করেন, সরকার একটি মীমাংসিত বিষয় নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। পঞ্চম সংশোধনীর মামলায় এই ইস্যুটির নিষ্পত্তি হয়ে গেছে (ইত্তেফাক, ২০ আগস্ট ২০১৪)।

আসলেই কি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল একটি মীমাংসিত বিষয়? এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কি একটি ঐকমত্য বিরাজ করছে? এ প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর খোঁজার জন্য ইতিহাসের দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন বিচারপতিদের অপসারণের বিষয়টি নিয়ে সংসদ ও আদালতের অতীতের সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনা করা। একই সঙ্গে প্রয়োজন বিশেষজ্ঞদের অতীতে দেয়া মতামত পর্যালোচনা করা।

উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের বিষয়টি বাহাত্তরের সংবিধানের ৯৬(২) অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে : ‘প্রমাণিত ও অসদাচরণ বা অসামর্থ্যরে কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাইবে না।’ কিন্তু ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির কাছে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।

স্মরণ করা যেতে পারে, জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তরের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ এক রায়ে পঞ্চম সংশোধনী প্রায় পুরোপুরি বাতিল করে দেন। তবে আদালত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সম্পর্কিত বিধানটি মার্জনা করেন। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগও কিছু পর্যবেক্ষণসহ হাইকোর্টের রায়ই মূলত বহাল রাখেন। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের মতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল রাখা হয়, কারণ তখন সব মত ও পথের আইনজীবীরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে অভিমত দিয়েছিলেন, বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে না রেখে সুপ্রিমকোর্টের হাতে রাখা উচিত।

অনেকেরই মনে আছে, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের আগে, ২০১০ সালে সরকার ১৫ সদস্যবিশিষ্ট যে বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার শরিক দলের প্রায় সব জ্যেষ্ঠ নেতাই তার সদস্য ছিলেন। কমিটি ২৭টি বৈঠক করে এবং তিনজন প্রধান বিচারপতি, দশজন আইনজীবী/বিশেষজ্ঞ, আওয়ামী লীগসহ ছয়টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, ১৮ জন বুদ্ধিজীবী, ১৮ জন সম্পাদক এবং সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সদস্যদের মতামত গ্রহণ করে।

কমিটির বৈঠকে সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল ও ফজলুল করিম; জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহমুদুল ইসলাম, ড. এম জহির ও আজমালুল হোসেন কিউসি এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বিচারপতিদের অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ৯৬(২) অনুচ্ছেদ সম্পর্কে মতামত দেন। কমিটির ষষ্ঠ বৈঠকে সিনিয়র অ্যাডভোকেট ড. এম জহির বলেন : ‘... সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল থাকবে এটা সম্বন্ধে আমার মনে হয় না কারও দ্বিমত আছে।’

কমিটির ১৮তম বৈঠকে বিচারপতি মোস্তফা কামাল বলেন : ‘‘কারও কারও চিন্তাধারায় এটা আছে যে, অরিজিনাল সংবিধানে অভিশংসনের যে পাওয়ার এটা ... রি-স্টোর করলে ভালো হয়। আমি বিনীতভাবে কয়েকটা কথা নিবেদন করব। মার্শাল ল’ যদি কোনো ভালো কাজ করে থাকে তাহলে এই ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ করেছে ... এই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে একটু শক্তিশালী করুন। একটা ইনভেস্টিগেটিভ এজেন্সি হিসেবে এর কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন করুন ... আপনি যদি অভিশংসনটা সংসদে দিয়ে যান তাহলে কিছু করতে পারবেন না। ভারতীয় পার্লামেন্টে অভিশংসন করার অধিকার আছে। কিন্তু ৬০-৭০ বছরে ভারতীয় পার্লামেন্ট ক’জন বিচারককে অভিশংসন করতে পেরেছে? আপনার আমার মতো তাদেরও অবস্থান একই ... আমার জজ সাহেব ঘুষ খান ... পয়সা নিয়ে জাজমেন্ট লিখেন, আমি এই খবরগুলোর জন্য কি সিআইডির কাছে যাব, ডিআইবির কাছে যাব। এর জন্য আলাদা ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি করতে হবে। তদারকি সেল যেটাকে বলা হয়। এই তদারকি সেলটা দেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে একটু শক্তিশালী করুন। কিন্তু এটা সংসদে আনবেন না প্লিজ।’’
সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম বলেন : ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ... এর কার্যকারিতা কিছুই নেই বলতে গেলে। এত কিছু হয়ে যাচ্ছে, পেপারে অনেক সত্য কথা এসেছে কিছু কিছু জাজ সম্বন্ধে। কোনো নড়চড় নেই ... অন্যান্য দেশে যেটা আছে, সেটাই আসতে হবে। তবে এর সঙ্গে আরেকটা কথা আছে। আমাদের যে পরিস্থিতি, তাতে আমাকে মাফ করবেন, এই রকম পার্লামেন্টে জাজদের এবং অন্যান্য যারা আছে তাদের ভাগ্য ছেড়ে দেয়া, সে সম্বন্ধেও আমরা আতঙ্কিত ... Independence of judiciary will be at stake ... Judge-দের behaviour-এরও প্রশ্ন আছে। এমন লঁফমব আছেন, যারা এমন নবযধাব করেন which amounts to misconduct. তার কোনো ব্যবস্থা নেই। আবার জাজ এমনই হয়েছেন যে, তাদের নিজেদের dignity কী তাই জানে না। গাড়ি থেকে নেমে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে ঝগড়া করেন। ... ফলে accountability of the judges সম্বন্ধে আমাদের চিন্তা করতে হবে।’ বৈঠকে তিনি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে সংসদ কর্তৃক বিচারপতিদের অপসারণের আশংকাও প্রকাশ করেন।

সাবেক প্রধান বিচারপতি মোঃ ফজলুল করিম বলেন : ‘একটি strong judiciary যদি না থাকে তাহলে দেশের ভিত সব সময় নড়বড়ে থাকবে ... একটি সুপ্রিম জুডিশিয়ারি কাউন্সিল থাকাটা খুবই ভালো দিক। Other than জিনিসটা পার্লামেন্টকে দিতে পারলে খুবই ভালো। কিন্তু পার্লামেন্টের ব্যাপার হচ্ছে যে, অনেকে অনেক সময় অপরাধের গুরুত্বটা ... অনুধাবন করবেন না। সেখানে হয়তো misjudgment-এর একটি আশংকা থেকে যেতে পারে। কিন্তু সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল যেটা পরবর্তীকালে করেছে এবং যেটা নিয়ে এতদিন যাবৎ কেউ কোনো উচ্চবাচ্য করেননি ... আমার মনে হয় সেটাকে যদি আর একটু সুন্দর পরিসরে implement করা যায় তাহলে সেটা সকলের জন্য সুখকর হবে ... সুতরাং কোর্টের ব্যাপারটা কোর্টের কাছে রেখে দিলে সবচেয়ে সুখকর হবে ... জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে তাদের চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স থাকবে। At the same time accountability of judges থাকবে ... এটা আমার ক্ষুদ্র অভিমত।’

সিনিয়র অ্যাডভোকেট আজমালুল হোসেন কিউসি বলেন : ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল সম্বন্ধে আমার নিজের ব্যক্তিগত কোনো মতামত নাই। উভয় চলতে পারে। আপনারা জজ সাহেবদের কাছেও রাখতে পারেন। আপনারাও নিয়ে আসতে পারেন। আমার মনে হয় যে, এটা more effective check and balance হবে যদি এটা পার্লামেন্টে আসে। উভয় পন্থাই আমরা অবলম্বন করতে পারি।’

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন : ‘৯৬ এখন যেভাবে আছে, জ্যেষ্ঠ তিনজন বিচারপতি, প্রধান বিচারপতিসহ- আমি এখানে আরও তিনজনকে যুক্ত করতে চাই, অ্যাটর্নি জেনারেল, পার্লামেন্টের একজন মেম্বার, যাকে স্পিকার মনোনয়ন দিয়ে পাঠাবেন, আর বারের যে কোন সিনিয়র মেম্বার, তাকে রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন করবেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এই ছয়জনকে নিয়ে হবে, শুধুমাত্র জজদের দিয়ে নয়। এই ছয়জনের মধ্যে যদি টাই হয়ে যায়, তিন তিন হয়ে যায়, তখন জিনিসটি পার্লামেন্টে আসবে।’ (সব উদ্ধৃতিই কমিটির কার্যবিবরণী থেকে নেয়া)

লক্ষণীয়, বিচারপতি হিসেবে ২০০৫ সালে এবিএম খায়রুল হক সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল রাখার পক্ষে রায় দেন। বস্তুত, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানকে মার্জনা করা ছাড়া তিনি পঞ্চম সংশোধনীর সবকিছুই বেআইনি ঘোষণা করেন। এমনকি তিনি পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে সংযোজিত বিচারপতিদের অপসারণ এবং অবসর গ্রহণের পর বিচার বিভাগীয় ও আধা-বিচার বিভাগীয় পদে নিয়োগের বৈধতা প্রদান সম্পর্কিত বিধানও বেআইনি ঘোষণা করেন। অবসর গ্রহণের পর এখন তিনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে, যেটি গ্রহণ করা তার দেয়া রায় অনুযায়ীই অবৈধ, তিনি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাতিলের এবং সংসদকে অভিশংসন ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার পক্ষে সাফাই গাইছেন। উল্লেখ্য, প্রধান বিচারপতি হিসেবে হাইকোর্ট ও সুপ্রিমকোর্টের ৭২ জন বিচারপতির সামনে ৩ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি সংসদের কাছে বিচারপতিদের দায়বদ্ধ করার বিরোধিতা করেন। এর কয়েক দিন পর জুডিশিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সেন্টারে অনুষ্ঠিত এক প্রকাশনা উৎসবেও তিনি এর বিরোধিতা করেন (নিউএইজ, ১৯ আগস্ট ২০১৪)। বস্তুত, বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান রাখার পক্ষে একটি ঐকমত্য বিরাজ করছে বলে মনে হয়, যদিও তারা এর সংস্কার চান।

প্রসঙ্গত, বিচারপতি ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সংসদীয় বিশেষ কমিটি- সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যে কমিটির কো-চেয়ারপারসন ছিলেন- ২৯ মে ২০১১ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান রেখে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব করে। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান বহাল থাকে। তাই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান যদি সংবিধানকে বিকলাঙ্গ করে থাকে, তার জন্য দায়ী বিচারপতি খায়রুল হক ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ আরও অনেকেই। 

তথ্যসূত্র: যুগান্তর, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
লিংক:
http://www.jugantor.com/sub-editorial/2014/09/17/148769
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

No comments:

Post a Comment