May 10, 2014

একজন শ্রমিকের জীবনের মূল্য কত?

রানা প্লাজার মর্মান্তিক দুর্ঘটনার এক বছর পার হলেও নিহত ও আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এখনো সুরাহা হয়নি। এমনকি নির্ধারিত হয়নি ক্ষতিপূরণের পরিমাণও। বস্তুত, এ নিয়ে বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে বর্তমানে ব্যাপক বাগিবতণ্ডা চলছে। আর ইতিমধ্যে নিহত ও আহত শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবারের অনেকেই অর্থাভাবে চরম মানবেতর জীবন যাপন করছে।

বাগিবতণ্ডার পেছনে মূল ইস্যুটি হলো: একজন মৃত শ্রমিকের জীবনের মূল্য কত? একজন মানুষের জীবনের মূল্য অবশ্য অর্থ দিয়ে নিরূপণ করা যায় না, কারণ যেকোনো ব্যক্তির জীবনই অমূল্য। তবু আমাদের উচ্চ আদালতের নির্দেশে অধ্যাপক এম এম আকাশের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির জন্য ১৪ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা পরিমাণের ক্ষতিপূরণ প্রদানের সুপারিশ করেছে।
আহত ব্যক্তিদের জন্য ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করা হয়েছে দেড় থেকে সাত লাখ টাকা। একজন মৃত শ্রমিকের জন্য প্রায় সাড়ে চৌদ্দ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ কি যথার্থ?
কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ইচ্ছাকৃত বা অবহেলাজনিত কারণে কারও মৃত্যু ঘটলে তাকে ‘রংফুল ডেথ’ বা অবৈধ মৃত্যু বলা হয়। মালিকের অবহেলায় কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মৃত্যু ঘটলে নিঃসন্দেহে তা অবৈধ মৃত্যু। এ ধরনের মৃত্যুর জন্য দেওয়ানি আদালতের শরণাপন্ন হয়ে ‘টর্ট’ আইনের অধীনে মালিকের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায়। রানা প্লাজায় এক হাজার ১৩৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ও সহস্রাধিক ব্যক্তির আহত হওয়ার পেছনে রয়েছে মালিকের অমার্জনীয় অবহেলা। তাই আহত-নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ মূলত ভবন ও কারখানার মালিকদেরই দিতে হবে। একই সঙ্গে দণ্ডবিধির আওতায় ‘রংফুল ডেথ’ ও ‘রংফুল ইনজুরি’ ঘটানোর অপরাধে মালিকদের শাস্তি হওয়াও জরুরি।
অবৈধ মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ নির্ণয়ের একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হলো সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আয়ের বর্তমান মূল্য (discounted value of future flow of earnings), যা সারা পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়ে থাকে। অর্থাৎ এ পদ্ধতিতে মৃত ব্যক্তি বেঁচে থাকলে ভবিষ্যতে সে যা আয় করতে পারত, তার বর্তমান মূল্যই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
এ ধরনের ডিসকাউন্টিং (discounting) পদ্ধতিতে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর: মৃতের বয়স, তার ভবিষ্যৎ আয়-ক্ষমতা এবং সুদের হার বা ডিসকাউন্ট রেট। মৃত ব্যক্তির অল্প বয়স হলে তাদের বেশি দিন বেঁচে থাকার এবং উপার্জন করার সম্ভাবনা থাকে। অবশ্যই লেখাপড়া, দক্ষতা ও যোগ্যতার ওপরও তাদের আয়ের ক্ষমতা নির্ভর করে। সুদের হার বেশি হলে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আয়ের বর্তমান মূল্য কম হবে। অন্যভাবে বলতে গেলে, সুদের হার বেশি হলে অপেক্ষাকৃত সামান্য অর্থ বিনিয়োগ করে ভবিষ্যতে অধিক প্রতিদান পাওয়া সম্ভব।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, সাড়ে চৌদ্দ লাখ টাকা পাওয়া গেলেও তার সবটাই প্রাপকের পক্ষে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে না। এর থেকে মৃত ব্যক্তির সৎকার, সন্তানের লেখাপড়া এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়া পর্যন্ত পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কিছু অর্থ ইতিমধ্যে ব্যয় করতে হয়েছে বা হবে। তাই কখন ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে, তার ওপর নির্ভর করে ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকার বেশি প্রাপকদের পক্ষে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
কমিটির প্রস্তাবিত ক্ষতিপূরণ থেকে ১২ বা ১৩ লাখ টাকা বিভিন্ন সুদের হারে বিভিন্ন মেয়াদে বিনিয়োগ করলে মাসিক ও বার্ষিক কত টাকা পাওয়া যাবে তার একটি হিসাব আমরা করেছি।
মৃত শ্রমিকদের প্রায় সবাই অল্প বয়সের। বেঁচে থাকলে তারা অনেক দিন কাজ করতে পারত। তাই আমাদের হিসাবে বিনিয়োগের মেয়াদ ৩০ থেকে ৪৫ বছর ধরা হয়েছে। উপরিউক্ত হিসাব অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ৩০ বছর ধরে ১০% সুদের হারে ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারী বার্ষিক এক লাখ ২৭ হাজার ২৯৫ টাকা বা মাসে আনুমানিক ১০ হাজার ৬০৮ টাকা উপার্জন করতে সক্ষম হবে। [এ ধরনের বিনিয়োগকে ‘এনুইটি’ (annuity) বলা হয়; পশ্চিমা দেশে বিমা কোম্পানিগুলো সাধারণত এ ধরনের এনুইটি বিক্রি করে থাকে) অর্থাৎ একজন মৃত শ্রমিক, যে বেঁচে থাকলে আরও ৩০ বছর কাজ করতে পারত, তার পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ দাঁড়াবে বার্ষিক এক লাখ ২৭ হাজার ৩০০ টাকা বা মাসে আনুমানিক ১০ হাজার ৬০৮ টাকা। অন্যভাবে বলতে গেলে, একজন শ্রমিক আগামী ৩০ বছর বার্ষিক এক লাখ ২৭ হাজার ৩০০ টাকা বা মাসে আনুমানিক ১০ হাজার ৬০৮ টাকা আয় করলে ১০% সুদের হারে তাঁর এসব আয়ের বর্তমান মূল্য হবে ১২ লাখ টাকা। তাই যে শ্রমিক মাসিক মাত্র ১০ হাজার ৬০৮ টাকা হারে আগামী ৩০ বছর আয় করতে পারত, বাজারে ১০% সুদের হার বিরাজ করলে তাকে ১২ লাখ (যোগ/প্লাস সামরিক ব্যয়ের জন্য আড়াই লাখ) টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া যথার্থ হবে। আর ১৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে সক্ষম হলে বার্ষিক ও মাসিক আয়ের পরিমাণ বেশি হবে।
মৃত শ্রমিকের কর্মজীবন ৪০ বছর ধরা হলে ১০% সুদের হারে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ দাঁড়াবে, আমাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর এক লাখ ২২ হাজার ৭১১ টাকা। প্রতি মাসে আনুমানিক ১০ হাজার ২২৬ টাকা। সম্ভাব্য কর্মজীবন ৪০ বছর হলে ১২% সুদের হারে এ অঙ্কের পরিমাণ দাঁড়াবে বার্ষিক এক লাখ ৪৫ হাজার ৫৬৪ টাকা বা মাসে আনুমানিক ১২ হাজার ১৩০ টাকা। লক্ষণীয় যে বিনিয়োগের মেয়াদ (বা কর্মজীবন) বৃদ্ধি হলে আয়ের পরিমাণ হ্রাস পায়। উপরিউক্ত হিসাব থেকে আরও দেখা যায়, মৃতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ মাসিক সর্বনিম্ন ১০ হাজার ৬০৮ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ৪৪৮ টাকা। যেহেতু বর্তমান সুদের হার ১০%-এর কাছাকাছি, তাই সর্বনিম্ন অঙ্কই অধিক বাস্তবসম্মত।
তবে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এ সামান্য অর্থ কি যুক্তিসংগত? মাসিক ১২-১৩ হাজার টাকা দিয়ে ৩০-৪০ বছর পরে একটি সংসার চালানো কি সম্ভব হবে? বস্তুত, দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির কারণে এ সামান্য অর্থ দিয়ে একটি সংসারের ভরণপোষণের কথা কল্পনা করাই দুরূহ। এমনকি বর্তমানে এই পরিমাণের অর্থ দিয়ে ঢাকার মতো শহরে একটি পরিবার চালানো প্রায় অসম্ভব। ক্যাবের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় চার সদস্যের একটি পরিবারের ভরণপোষণের জন্য প্রায় ১৯ হাজার টাকা প্রয়োজন। তাই মৃত শ্রমিকদের মাথাপিছু সাড়ে চৌদ্দ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান যুক্তিযুক্ত নয় বলেই আমরা মনে করি।
আরেকটি কারণেও প্রস্তাবিত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ সব মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষতিপূরণ একই পরিমাণের হতে পারে না। বয়স ও সম্ভাব্য আয়ের ক্ষমতার ভিত্তিতে এর পরিমাণ ভিন্ন হতে বাধ্য। মৃত শ্রমিক কম বয়স্ক হলে তার সম্ভাব্য কর্মজীবন বেশি হতো, ফলে তার পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বেশি হওয়া উচিত। একইভাবে যে মৃত শ্রমিকের আয়ের ক্ষমতা বেশি, তার জন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণও বেশি হবে। তাই সব মৃত শ্রমিকের জন্য একই পরিমাণের ক্ষতিপূরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমাদের হিসাবে শুধু আর্থিক বিষয়টিই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তাজরীন ফ্যাশনসের দুর্ঘটনার কারণে অনেক সন্তান বাবা-মা হারিয়েছে। অনেক বাবা-মা হারিয়েছেন তাঁদের সন্তান। অনেক স্বামী হারিয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী। এসব ক্ষতি টাকার অঙ্ক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তাই টর্ট মামলায় মৃত ব্যক্তির পরিবারের ‘ইমোশনাল ডিসট্রেস’ বা মানসিক চাপের জন্যও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। এ কারণে পশ্চিমা দেশে টর্ট মামলায় অনেক সময় কোটি কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
তবে কেউ যুক্তি দিতে পারেন যে তৈরি পোশাকশিল্পের বর্তমান ন্যূনতম বেতন অনেক কম, তাই প্রস্তাবিত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ অযৌক্তিক নয়। কিন্তু অধিকাংশ শ্রমিকেরই বেতন-ভাতা ন্যূনতম মজুরি থেকে বেশি। এ ছাড়া অনেক মৃত শ্রমিকেরই অতিরিক্ত আয়ের উৎস ছিল। তাই কিছু কিছু শ্রমিকের জন্য প্রস্তাবিত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ গ্রহণযোগ্য হলেও অধিকাংশ শ্রমিকের জন্য তা যৌক্তিক বলে মনে হয় না।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, মে ০১, ২০১৪

No comments:

Post a Comment