Apr 16, 2014

কারচুপির নির্বাচনই নিয়ামক হবে?

গণতন্ত্র বলতে আমরা বুঝি জনগণের সম্মতির শাসন। কীভাবে এই সম্মতি অর্জিত হবে? এজন্য নির্ধারিত পদ্ধতি রয়েছে এবং আধুনিক বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে সেটাই স্বীকৃত। জনগণকে এ জন্য সংবিধানের মাধ্যমে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে_ নির্দিষ্ট সময় পর পর ভোটের আয়োজন। এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে জনগণ বিভিন্ন ব্যক্তি এবং সমষ্টিগতভাবে দলকে ক্ষমতায়িত করে। যারা এই দায়িত্ব লাভ করেন নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সে দায়িত্ব তারা পালন করেন। 
এ ক্ষেত্রে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জনগণের সত্যিকারের সম্মতি রয়েছে কি-না, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা। তাদের স্বার্থ দেখবে, এমন প্রতিনিধি যাতে তারা নির্বাচিত করতে পারে সে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা চাই। এ নির্বাচন কোনোভাবেই নামকাওয়াস্তে হতে পারবে না। নির্বাচনে যারা প্রার্থী হতে চায়, তাদের জন্য তেমন সুযোগ থাকতে হবে।
প্রার্থীরা অবাধে তাদের পক্ষে ভোট প্রদানের জন্য যেন প্রচার চালাতে পারেন, তেমন পরিবেশ থাকা কাম্য। সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হিসেবে বিষয়টি পরিচিত। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এ ক্ষেত্রে বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। জনগণ যে প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেয় তার হিসাবেই সেটা যুক্ত হতে হবে। নির্বাচন হতে হবে নির্দিষ্ট সময় পর এবং এর প্রতিক্রিয়া হওয়া চাই স্বচ্ছ। কেউ যেন বলপ্রয়োগ করে কিংবা অর্থের দাপট দেখিয়ে জনগণের মতামত প্রদানের কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে, সেটা তাদের দেখতে হবে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বই এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক। তারা জনগণের পক্ষ হয়ে এ দায়িত্ব পালন করবে_ এটাই দেশের সংবিধান নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটিকে অবশ্যই স্বাধীন ও ক্ষমতাবান হতে হবে। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন এ ধরনের মর্যাদা এখন ভোগ করছে। তাদের নিজস্ব সচিবালয় রয়েছে। আর্থিক বিষয়েও তারা যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পর নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বিশেষভাবে বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার সাধিত হয়। এমনকি তারা নির্বাচনের সময় প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের ক্ষমতাও পেয়ে যায়। তফসিল ঘোষণার পর পুলিশ-আনসার-ভিডিপি-র‌্যাব তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এ বছরের ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচন এবং ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসজুড়ে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে তারা সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহারের ক্ষমতাও লাভ করে। এই দুটি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন সেনাবাহিনী ব্যবহার করেছে। এক কথায়, স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য যা কিছু দরকার, সংবিধান ও আইন তাদের সে ক্ষমতা প্রদান করেছে। তারা দরকার পড়লে আইন ও বিধিবিধান সংযোজন করার ক্ষমতাও রাখে। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদ এ ধরনের ক্ষমতা ভোগ করে। কিন্তু সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে নির্বাচন কমিশনও এ অধিকার পেয়েছে। প্রকৃতই আমাদের নির্বাচন কমিশনকে আমরা ক্ষমতার ভাণ্ডার বলতে পারি। কেউ কেউ তো মজা করে বলেন যে, তাদের হাতে নারীকে পুরুষ এবং পুরুষকে নারী করার ক্ষমতা ব্যতীত সবকিছুই রয়েছে।
অর্থাৎ আমাদের নির্বাচন কমিশন এমন একটি আইনি কাঠামো পেয়েছে, যা দেশ শাসনের জন্য জনগণের সম্মতি কারা পাবে সেটা নির্ধারণের যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। কিন্তু তারা এই ক্ষমতা সব সময় প্রয়োগ করতে পারেনি কিংবা চায়নি। অতীতে এটা যখন ঘটেছে, তখন যুক্তি দেওয়া হতো যে নির্বাচন কমিশনের হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা নেই। সামরিক শাসন থাকার সময়ে এ বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসত। কিন্তু এখন তা বলার উপায় নেই। অথচ ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত পাঁচ ধাপে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় আমরা দেখেছি যে, তারা পরিস্থিতির ওপর আদৌ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়নি।
সঙ্গতভাবেই আমরা তাই বলতে পারি যে, নির্বাচন কমিশনের কেবল ক্ষমতা থাকলেই হবে না, এটা প্রয়োগের জন্য তাদের আন্তরিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। তারা যদি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারে তাহলে জনগণ তাদের জেনুইন বা প্রকৃত প্রার্থী ও দলকে নির্বাচিত করতে পারবে না।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। এ প্রক্রিয়া ছিল গণতন্ত্রের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক। কিন্তু একটি স্বচ্ছ পদ্ধতির মাধ্যমে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা কি নিরপেক্ষভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন সে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন_ কমিশন আদৌ সেটা চাইছে কি-না। গত দুটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে খোদ নির্বাচন কমিশনই বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ তো তাদের প্রধান বাধা হিসেবেই চিহ্নিত করছেন। তাদের রয়েছে স্বাধীনতা এবং বিপুল ক্ষমতা, কিন্তু সেটা প্রয়োগ করার কোনো আগ্রহ নেই।
এই নির্বাচন কমিশনকে কিন্তু প্রথম দিকে আমরা ভিন্ন ভূমিকায় দেখেছি। এ কমিশনের আগে এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশন পাঁচ বছর দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। বর্তমান সরকার দাবি করে যে, তাদের আমলে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের যেসব নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ কৃতিত্ব প্রদানে কারও আপত্তি করা ঠিক হবে না। তবে এটাও মনে রাখা দরকার যে ৬-৭টি সিটি করপোরেশন নির্বাচন বাদে বাকি সব নির্বাচন কিন্তু পূর্ববর্তী কমিশনের আমলে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ পাঁচটি সিটি করপোরেশন কেবল অনুষ্ঠিত হয় বর্তমান কমিশনের অধীনে এবং তারা ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে অবশ্যই প্রশংসা পাবে। সরকার এসব নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চায়নি এবং কমিশনের সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য এ পরিবেশ সহায়ক।
কিন্তু সরকার যখন আগ্রাসী হয়? যখন তারা পছন্দের প্রার্থীকে জয়ী করিয়ে আনতে চায়? এমন পরিস্থিতিতেই নির্বাচন কমিশনের আসল পরীক্ষা হয়ে থাকে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। সাধারণ নির্বাচন এবং উপজেলা নির্বাচনে অনেক প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। কিন্তু তারা অভিযুক্ত একজন প্রার্থীকেও শাস্তি দিতে পারেনি। এমনকি তার উদ্যোগ গ্রহণেও উৎসাহী ছিল না। উপজেলা নির্বাচনের সময় বিপুলসংখ্যক আসনে প্রার্থীরা বাড়াবাড়ি করেছেন। জোরজবরদস্তি ও সহিংস ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন অসহায়ের মতো তা অবলোকন করেছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদেরও এ অনিয়মে শামিল হতে দেখা গেছে। প্রকৃতপক্ষে বর্তমান নির্বাচন কমিশন ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচন এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চের উপজেলা নির্বাচনে তাদের স্বাধীনসত্তা ও ক্ষমতা জলাঞ্জলি দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ এবং ইন্টারন্যাশনাল কভনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস অনুযায়ী জেনুইন নির্বাচন আয়োজনে তাদের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল যে তারা এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। এ দায়িত্ব পালনে তারা অপারগ নাকি আদৌ সেটা চায়নি, সেটা অবশ্যই বিবেচনার বিষয়। কিন্তু প্রথম বিষয় হচ্ছে, তাদের ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়া।
উপজেলা নির্বাচনে সরকারি দল জয়ী হয়েছে। কিন্তু কীভাবে জয়ী হয়েছে? সাধারণভাবে দেখা যায়, জাতীয় নির্বাচনের পরপর স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সংসদে বিজয়ী দল তাতে লাভবান হয়। কিন্তু উপজেলা নির্বাচনে তেমনটি দেখা গেল না। প্রকৃতপক্ষে, এভাবেই উপজেলা নির্বাচনে শাসক দলের নৈতিক পরাজয় ঘটেছে। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। তাদের কর্মী-সমর্থক সংখ্যা বিপুল। এই দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের গৌরবময় সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মহান আদর্শ তিনি ঊধর্ে্ব তুলে ধরেছেন এবং জনগণের মধ্যে এর চেতনা সঞ্চারিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও ছিলেন অগ্রণী। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি স্বাধীনতার পাশাপাশি মুক্তির কথাও বলেছিলেন। এই দলের বর্তমান কাণ্ডারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গর্বের সঙ্গেই বলেন যে, তারা মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিএনপি ও এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে তারা ভোট ডাকাতির অভিযোগ এনে থাকে। কিন্তু এখন তারা বড় গলায় তেমন দাবি করতে পারবে বলে মনে হয় না। পরপর দুটি নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক লোক তাদের ভোটের অধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং এর দায় দলটি এড়াতে পারে না।
যে কোনো রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য থাকে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার। কারচুপি, ভোটের বাক্স নির্বাচনের আগেই ভরে যাওয়া, কেন্দ্রে প্রতিপক্ষের নির্বাচনী এজেন্টকে থাকতে না দেওয়া_ এসব জয়ের নিয়ামক হয়ে গেলে সব দল এ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়বে। তারা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যাবে না, তাদের পক্ষে টেনে আনায় সচেষ্ট হবে না। বরং জবরদস্তির জন্য যাদের প্রয়োজন পড়বে তাদের পেছনে বিনিয়োগ করবে। ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। সংঘাত বাড়বে। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে চলবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।
নির্বাচন আয়োজন করা হয় সুন্দর পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু যদি কারচুপির নির্বাচনই নিয়ামক হয়ে ওঠে তাহলে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়। আশির দশকে এইচএম এরশাদের পতনের পেছনে মূল ইস্যু ছিল জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া। রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে ছিল সর্বত্র হিংসা ও হানাহানি। আমরা কি সেই আমলে ফিরে যেতে চাই? সাম্প্রতিক সংসদ ও উপজেলা নির্বাচন সেই শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। শনিবার ফেনী ও চৌমুহনী পৌরসভার নির্বাচনেও একই অনিয়মের পুনরাবৃত্তি। রোববার ফেনী পৌরসভা নির্বাচন বিষয়ে সমকালের শিরোনাম ছিল : 'কেন্দ্রে ভোটার ছিল না, তবু দুপুরেই ভরে গেল ভোটের বাক্স'। আমরা যদি এ প্রক্রিয়া থামাতে না পারি তাহলে আগামীতে সব ধরনের নির্বাচনেই এ পদ্ধতি অনুসৃত হবে। এটা কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। এখন সবারই জেগে ওঠার সময়। সরকার ও বিরোধী দল এবং নাগরিক সমাজ সবাইকেই অশনিসংকেত শুনতে হবে এবং করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। এ অনিয়মের বৃত্ত না ভাঙলে কেউ রেহাই পাবে না।
তথ্যসূত্র: সমকাল, ০৭ এপ্রিল, ২০১৪

No comments:

Post a Comment