Apr 14, 2014

স্থানীয় সরকার নির্বাচন পদ্ধতি: নির্দলীয় না দলীয়?

বিধিবিধান অনুযায়ী ও ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হবার কথা। কিন্তু আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে দলীয়ভাবে মনোনয়ন প্রদান এবং তথাকথিত 'বিদ্রোহী' প্রার্থীদেরকে বহিষ্কার বা জোর করে বসিয়ে দেয়ার কারণে চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনেকটাই দলীয় নির্বাচনের রূপ নিয়েছে। ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রেও গণমাধ্যম নির্বাচিতদের দলীয় পরিচিতিই তুলে ধরেছে।

এমনি প্রেক্ষাপটে গত ৯ মার্চ, ২০১৪ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ভবিষ্যতে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবার ঘোষণা দেন। এজন্য সংশ্লিষ্ট আইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এরপর ১৮ মার্চ, ২০১৪ মাননীয় মন্ত্রীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় করা সংক্রান্ত আইনে পরিবর্তন আনতে হবে এবং ভবিষ্যতে স্থানীয় সব নির্বাচন দলীয়ভাবে হতে হবে। সর্বশেষ ২৭ মার্চ, ২০১৪ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক আলোচনা সভায় আগাামী দিনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন।

এমন এক সময়ে এ বিতর্ক উত্থাপন করা হয়েছে যখন উপজেলা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও সহিংসতা রোধে সরকার ও নির্বাচন কমিশন অনেকটাই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা দেখেছি যে, প্রথম পর্বের উপজেলা নির্বাচন বহুলাংশে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলেও দ্বিতীয় পর্ব থেকে নির্বাচনে ক্রমবর্ধমান হারে সহিংসতা ও অনিয়ম দেখা দেয়। পর্বে পর্বে ব্যালট পেপারে সিল মারা, ব্যালট বক্স ছিনতাই, আগে থেকেই ব্যালট বক্স ভরে রাখা, কেন্দ্র দখল, তথা অনিয়ম ও কারচুপির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। বৃদ্ধি পায় সহিংসতা, যার ফলে ডজনখানেক ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটে। একই সঙ্গে বাড়ে সরকারি দল তথা আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের জয়ের পরিমাণ। তাই অনেকে মনে করছেন, নির্বাচনে অনিয়ম ও সহিংসতা হরাসে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতাকে আড়াল করতেই আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় না নির্দলীয় হওয়া উচিত এ বিতর্ক উত্থাপন করেছেন। অথচ এখনকার আলাপ-আলোচনার বিষয় হওয়ার দরকার ছিল — প্রথমত, সুষ্ঠুভাবে উপজেলা নির্বাচন করতে কমিশনের ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া, যাতে ভবিষ্যতে যে কোনো নির্বাচনে একই ধরনের অনিয়ম ও সহিংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের পর কীভাবে উপজেলা পরিষদকে কার্যকর করে স্থানীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা যায়, সে ব্যাপারে আইনি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া।

বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্দলীয় না দলীয় ভিত্তিতে করা উচিত এ বিতর্ক দীর্ঘদিনের। আওয়ামী লীগসহ আমাদের অনেক রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দই মনে করেন, দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়া দরকার। এটি শুনতেও ভাল শোনা যায়। কারণ তাদের মতে, দলনিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা হবে 'অরাজনৈতিক'। তাদের কাছে রাজনীতি মানেই দল — দল ছাড়া তারা রাজনীতির কথা ভাবতেই পারেন না, ফলে দলীয় পরিচয়ের বাইরের নির্বাচনকে তারা 'বিরাজনীতিকীকরণ' বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু 'নির্দলীয়' আর 'অরাজনৈতিক' শব্দ দুটি সমার্থক নয়। বস্তুত নির্বাচনই একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যা দলভিত্তিক কিংবা নির্দলীয়ও হতে পারে। এছাড়াও দলনিরপেক্ষ হলেও দলের নেতা-কর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে কোনো বাধা থাকে না, তাই নির্দলীয় নির্বাচনকে বিরাজনীতিকীকরণ প্রক্রিয়া বলা নিতান্তই আবেগ সৃষ্টিকারী সস্তা বাগাড়ম্বর বৈ আর কিছুই নয়! স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় মনোনয়নের ভিত্তিতে না হওয়ার কারণে বিরাজনীতিকরণের অভিযোগ তোলা হলেও আমাদের দেশে বিরাজনীতিকরণ হয়েছে মূলত 'মনোনয়ন-বাণিজ্যে'র ফলে। নির্বাচনে মনোনয়ন 'বিক্রি'র ফলে নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদেরা মনোনয়ন থেকে ক্রমাগতভাবে বঞ্চিত হয়েছেন। যে কারণে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ হয়ে পড়েছে অনেকটা কোটিপতিদের ক্লাবে।

স্থানীয় সরকার দলীয় ভিত্তিতে না নির্দলীয় হওয়া উচিত? এক্ষেত্রে পক্ষে, বিশেষত বিপক্ষে অনেক যুক্তি রয়েছে। নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হলে প্রথমত, এর মাধ্যমে ভোটারদের 'চয়েস' বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধি বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক সমাজসেবী আছেন, যারা কোন দলের সাথে সরাসরি যুক্ত নন কিংবা যুক্ত হতে চান না — তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছেন যারা অত্যন্ত যোগ্য, সম্মানিত এবং স্থানীয় মানুষের আস্থাভাজন। নির্দলীয় নির্বাচন হলে এসকল ব্যক্তির নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়, যা নিঃসন্দেহে জনকল্যাণ বয়ে আনে। উদাহরণস্বরূপ, ১৫ জুন ২০১৩ চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলভিত্তিক মনোনয়ন দেয়ার ফলে আশঙ্কাজনকহারে প্রার্থীর সংখ্যা কমে যায়। ২০০৮ সালে মেয়র পদে যেখানে প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৪৮ জন, ২০১৩ সালের নির্বাচনে তা নেমে আসে মাত্র ১২ জনে, আর কাউন্সিলর পদে ৯৯৩ জনের বিপরীতে ২০১৩-এ তা এসে দাঁড়ায় ৭৪৬ জনে।

দ্বিতীয়ত, নির্দলীয় নির্বাচন হলে এর মাধ্যমে দলবাজি তথা রাজনৈতিক হানাহানির সর্বনাশা প্রভাব তৃণমূলে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব হবে। বস্তুত রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের চালিকাশক্তি এবং দল ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না। কিন্তু দলবাজি প্রতিফলিত হয় দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য, দলাদলি, দলীয়করণ ও দলীয় বিবেচনায় সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা সুযোগ-সুবিধা বিতরণ এবং এর বিরূপ প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক। উদাহরণস্বরূপ, ১ জানুয়ারি, ২০১০ 'পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক খুনাখুনির ঘটনা উদ্বেগজনক: চিদাম্বরম' শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে লিখিত এক চিঠিতে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক খুনের ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজ্যের অনেক স্থানে আইনশৃঙ্খলা বলে যে কিছু নেই — তা এসব খুনাখুনির ঘটনায় প্রমাণিত। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখেন, দলীয় ক্যাডাররাই যদি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব হাতে তুলে নেয় তাহলে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা কী? এ প্রতিবেদন থেকেই বোঝা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ক্যাডারদের মধ্যে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত বহুলাংশে দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচনেরই বিষফল। আমরা কি আমাদের রাজনীতিকে সেদিকে নিয়ে যেতে চাই? নিশ্চই না।

তৃতীয়ত, দলভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যেই নয়, দলের অভ্যন্তরেও কোন্দল সৃষ্টি করতে পারে। এ দলাদলি অহেতুক। আর দল মনোনয়ন প্রদান থেকে বিরত থাকলে, দলের মধ্যকার সর্বাধিক জনপ্রিয় ব্যক্তি নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ পাবে।

সাধারণ নাগরিকদেরকেও দলভিত্তিক নির্বাচনের মাশুল গুণতে হয়। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, যে সকল এলাকায় সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ছিলেন, সে সকল এলাকায়ই বেশি সরকারি বরাদ্দ ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল। কোন কোন এলাকা এবং জেলার প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এমনিতেই দেশে বিরাজমান দলীয়করণের কারণে বিরোধীদলের নেতা-কর্মী-সমর্থক ও নির্দলীয় ব্যক্তিরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে। এমনকি দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে, যাদের শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষক নেই, তারাও বিভিন্ন ফায়দা থেকে বঞ্চিত হয়। দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে এ বঞ্চনা তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাবে বলে আমাদের আশঙ্কা। এবার একটি ক্ষেত্রে বৈষম্য ইতিমধ্যে আমাদের চোখে পড়ছে। যেমন, ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিরোধীদল থেকে মেয়র পদে জয়ী হওয়ায় বিজয়ী মেয়রদের এখন পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দেয়া হয়নি। এর আগে এই চার সিটিতে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় মেয়রগণ সকলেই প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা পেয়েছেন। ভোগ করেছেন গাড়িতে জাতীয় পতাকা, বাড়তি নিরাপত্তাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা।

নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নির্দলীয় নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তখন ভোটারদের অনেক বেশি 'চয়েস' থাকে। ফলে তাদের পক্ষে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়ার বেশি সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগত মানে পরিবর্তন সাধনে সহায়তা করে। আর সত্, যোগ্য, দক্ষ ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিরা নির্বাচিত হলেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়।

আর দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে দুটি যুক্তি উপস্থাপন করা হয়, প্রথমত, দলীয় নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়। কিন্তু এটি অনেকটা দুর্বল যুক্তি, কারণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব সকল নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করা, দল বিশেষের নয়। এছাড়াও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণে তেমন ভূমিকা রাখেন না, ফলে তাদের পক্ষে দলীয় নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। দ্বিতীয়ত, দলীয়ভাবে নির্বাচন হলে স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও দলীয় শৃঙ্খলার অধীনে আসে। ফলে তাদের পক্ষে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বাস্তবতা তার উল্টো। আমাদের সমাজে অধিকাংশ অন্যায় ও গর্হিত কাজই পরিচালিত হয় সরাসরি দলীয় ছত্রছায়ায় অথবা দলীয় সমর্থনে। বস্তুত দলের বিশেষত সরকারি দলের সমর্থন ছাড়া কেউ অপরাধ করে পার পায় না।

পরিশেষে, দলভিত্তিক নির্বাচন করতে হলে এজন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে। যেমন, কীভাবে দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হবে সে প্রক্রিয়া আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়াও দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে দেশে গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও সত্যিকারের জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক দলের ব্যাপক সংস্কার। তা না হলে আমাদের বিদ্যমান সমস্যাগুলো, বিশেষত দলবাজি, পক্ষপাতিত্ব ও সহিংসতার সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আমাদের আশঙ্কা। 

তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক, 14 এপ্রিল, 2014

No comments:

Post a Comment