Mar 30, 2014

কে জিতেছে উপজেলা নির্বাচনে?

২৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল চতুর্থ দফা উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। প্রথম আলোর (২৪ মার্চ ২০১৪) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৭৭ উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ ১৬৮টিতে, বিএনপি ১৪৪টিতে, জামায়াতে ইসলামী ৩৩টিতে, জাতীয় পার্টি তিনটিতে এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের সমর্থিত প্রার্থীরা ২৯টিতে জয়ী হয়েছেন; যদিও বিধিবিধান অনুযায়ী এ নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়ার কথা নয়। আর প্রাপ্ত ৩৭৪ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ২৫৫ জন, বিএনপির ২৭১ জন, জামায়াতের ১২৯ জন, জাতীয় পার্টির নয়জন এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের সমর্থিত ৭৭ জন প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। অর্থাৎ, চার পর্বের নির্বাচনের পর সার্বিকভাবে অধিকসংখ্যক চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা বেশিসংখ্যক ভাইস চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন।

পর্বভিত্তিক গণনা করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ তৃতীয় ও চতুর্থ পর্বে জয়ী হলেও বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা প্রথম দুই পর্বে জিতেছেন। প্রথম দুই পর্বে বিএনপির প্রার্থীরা ৯৭টি চেয়ারম্যান ও ১৭১টি ভাইস চেয়ারম্যান পদে জয়লাভ করেছেন। অর্থাৎ, আমাদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলই উপজেলা নির্বাচনে ‘জয়ী’ হয়েছে। কিন্তু তাহলে পরাজিত হলো কারা?
আমরা মনে করি যে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জয়ী হলেও ‘পরাজিত’ হয়েছে বাংলাদেশের জনগণ। কারণ, এই নির্বাচনে আমাদের রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্রবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রম অধঃপতন আরও প্রকট হয়েছে। এর মাধ্যমে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গিয়েছে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। বলা বাহুল্য, রাষ্ট্রবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাজনৈতিক দলও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, বেশিসংখ্যক চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে জিতলেও নৈতিকভাবে আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর, বিশেষত ক্ষমতাসীনদেরও পরাজয় ঘটেছে।
নির্বাচন কমিশন আমাদের অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এর দায়িত্ব সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ, তথা গ্রহণযোগ্য জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের ভাষায়, ‘জেনুইন’ বা সঠিক নির্বাচন অনুষ্ঠান। এ লক্ষ্যে কমিশনকে আমাদের সংবিধান ‘স্বাধীন’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দিয়েছে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে অগাধ ক্ষমতা। এমনকি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মতে, আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে সংযোজনের ক্ষমতাও, যে ক্ষমতা সাধারণত আইনসভার জন্যই নির্ধারিত।
এ ছাড়া কমিশন যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সে লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০০৮ জারি করে কমিশনের সচিবালয়কে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় থেকে বিযুক্ত করা হয়েছে। জাল ভোট প্রতিরোধের লক্ষ্যে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে।
নির্বাচনী আইনের ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’র সংজ্ঞায় আনসার, পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব অন্তর্ভুক্ত। এমনকি বর্তমান উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আমাদের সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনের সময় সব প্রশাসনিক কর্মকর্তাও কমিশনের কাছে ন্যস্ত থাকে। অর্থাৎ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কমিশনকে শুধু স্বাধীনই করা হয়নি, এটিকে প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে, দেওয়া হয়েছে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রশাসন, সামরিক বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। অর্থাৎ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে যা যা দরকার, তার সবকিছুই কমিশনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পরিপূর্ণ স্বাধীনতা, বলপ্রয়োগসহ সব ধরনের ক্ষমতা কমিশনের হাতে থাকা সত্ত্বেও আমাদের নির্বাচন কমিশন চলমান উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে পারছে না। প্রথম পর্বের নির্বাচনে যত অনিয়ম ও কারচুপি ঘটেছে, তার চেয়ে বেশি ঘটেছে দ্বিতীয় পর্বে, তার চেয়ে বেশি ঘটেছে তৃতীয় পর্বে এবং তার চেয়েও, বহু প্রচারিত কঠোরতা প্রদর্শন সত্ত্বেও, বেশি ঘটেছে চতুর্থ পর্বে। অনিয়ম ও কারচুপির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল জাল ভোট প্রদান, কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স স্টাফিং, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, প্রতিপক্ষের নির্বাচনী এজেন্টকে বের করে দেওয়া, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা দেওয়া ইত্যাদি। শুধু অনিয়ম ও কারচুপিই নয়, প্রতি পর্বে ক্রমাগতভাবে সহিংসতাও বেড়েছে। প্রথম পর্বে কেউ নিহত না হলেও দ্বিতীয় পর্বে একজন, তৃতীয় পর্বে তিনজন এবং চতুর্থ পর্বে চারজনের প্রাণহানি ঘটেছে।
শুধু তা-ই নয়, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কিছু অনিয়ম ও কারচুপি লক্ষ করা গিয়েছে, যা অতীতে কখনো ঘটেনি। যেমন, আমাদের অতীতের নির্বাচনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে জাল ভোট পড়লেও সেগুলো ঘটত নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা সেসব কর্মকর্তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে। কিন্তু বর্তমান উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বেড়াকেই খেত খেতে দেখা গিয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনী কর্মকর্তার যোগসাজশে ভোট শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করারও অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া নির্বাচনী কর্মকর্তাকে বেঁধে রাখার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক অন্তত একজন কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও বর্তমান নির্বাচনে ঘটেছে।
এটি সুস্পষ্ট যে আমাদের নির্বাচন কমিশন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি ও সহিংসতা রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে পুরো নির্বাচন-প্রক্রিয়ার ওপর। শুধু তা-ই নয়, বরং নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে সাফাইও গেয়েছে এবং নিজেদের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে গিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দুর্দশাগ্রস্ত হলে—যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সঠিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো—দেশের জনগণ যে ‘পরাজিত’ পক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, তা বলারই অপেক্ষা রাখে না। কারণ, কমিশনের অকার্যকারিতা ও প্রশ্নবিদ্ধতার কারণে ভবিষ্যতের সব নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। এমন পরিস্থিতি আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সংকটের দিকে ঠেলে দিতে বাধ্য। তাই কমিশনের অপারগতার মাশুল জনগণকেই গুনতে হবে, যা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও—চেয়ারম্যান পদে বেশি আসন পাওয়া সত্ত্বেও—নৈতিক ‘পরাজয়’ ঘটেছে। তৃতীয় ও চতুর্থ পর্বের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীদের বিজয়ের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি, কারচুপি ও সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের কিছু অভিযোগ উঠলেও এ অভিযোগ ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ব্যাপক। আর এসব অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। ১৫ ও ২৪ মার্চের প্রধান জাতীয় দৈনিকগুলোর শিরোনামগুলো এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল। আর মুক্তিযুদ্ধের এবং পরবর্তীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে রচিত আমাদের সংবিধানের অন্যতম অঙ্গীকার হলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যার অন্যতম পূর্বশর্ত। এ ছাড়া আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বহুদিন থেকেই বলে আসছেন যে তাঁর রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য মানুষের ভোটের ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের পর থেকে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা আরও বলে আসছেন যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করা যায়।
কিন্তু উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যা ঘটেছে, তাতে আওয়ামী লীগের বিশ্বাসযোগ্য, তথা নৈতিক অবস্থান আজ দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এমনকি দলের মধ্যেও এ ব্যাপারে অসন্তুোষ আছে বলে শোনা যায়’ (সমকাল, ২৫ মার্চ ২০১৪)।
উপজেলা নির্বাচনে সরকারও ‘পরাজিত’ হয়েছে। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মদদেই অনেক অনিয়ম ঘটেছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে অনেক সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু দলবাজ কর্মকর্তা পুরো সরকারকেই বিতর্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন।
পরিশেষে, রাজনীতিবিদেরা রাজনীতি করেন তাঁদের জনসেবা, যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে। কিন্তু নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি ও সহিংসতা অব্যাহত থাকলে সে পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। অর্থ ও পেশিশক্তিই তখন নির্বাচনে জেতার মূল নিয়ামক হয়ে দাঁড়াবে, যা আমাদের সহিংসতার এক দুষ্টুচক্রের মধ্যে ঠেলে ফেলে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং আমরা এক ভয়াবহ অশান্ত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হব। এমন সম্ভাবনা এড়ানোর জন্য রাজনীতিবিদসহ আমাদের সবাইকে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, মার্চ ৩১, ২০১৪

No comments:

Post a Comment