Mar 18, 2014

কেমন হচ্ছে উপজেলা নির্বাচন

বহু অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে দুই পর্বে ২১৫টি উপজেলায় নির্বাচন সম্পন্ন হলো। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল প্রথম পর্বের ৯৭ এবং দ্বিতীয় পর্বের ১১৫টি, যার মধ্যে পাঁচটিতে নির্বাচন বা নির্বাচনী ফলাফল স্থগিত করা হয়েছে। নির্বাচনী ফলাফল থেকে দেখা যায় যে প্রথম পর্বে চেয়ারম্যান পদে বিএনপি ৪৪টি, আওয়ামী লীগ ৩৪টি, জামায়াতে ইসলামী ১৩টি, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) একটি ও অন্যরা পাঁচটি উপজেলায় জয়ী হয়েছেন। দ্বিতীয় পর্বে বিএনপি ৫১টি, আওয়ামী লীগ ৪৫টি, জামায়াতে ইসলামী আটটি, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) একটি এবং অন্যরা ছয়টি উপজেলা চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন। দুই পর্বের নির্বাচনী ফলাফল থেকে দেখা যায় যে বিএনপি আওয়ামী লীগ থেকে চেয়ারম্যান পদে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে আছে। এমনকি ভাইস-চেয়ারম্যান পদেও বিএনপি এগিয়ে।

গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ অনুষ্ঠিত বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ‘কৌশল’-এর দিক থেকে বিএনপির চরম পরাজয় ঘটেছিল বলে অনেকের ধারণা। অনেকেই মনে করেছিলেন যে বিএনপি ‘নিশ্চিহ্নপ্রায়’ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি প্রধানমন্ত্রীকে আমরা বলতে শুনেছি যে বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া আন্দোলনে ফেল, পরীক্ষায় ফেল, অর্থাৎ সবকিছুতেই অসফল। তাই বিএনপির এ ‘বিজয়’ বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এটি আরও প্রণিধানযোগ্য এ কারণে যে বিএনপির অনেক নেতাই কারাগারে রয়েছেন এবং আবার অনেকে বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনের আগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। ফলে অনেক উপজেলায় বিএনপি-জামায়াতের কর্মী-সমর্থকেরা অনেকটা পলায়নপর অবস্থায় ছিলেন।
বিএনপির এ জয়ের কারণ কী? জয়ের তাৎপর্যই বা কী? নির্বাচনটিই বা কেমন হলো?
প্রথমেই বলা আবশ্যক যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ার কথা থাকলেও দলভিত্তিক মনোনয়ন দিয়ে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বিধিবিধান লঙ্ঘন করেছে। জোর করে প্রার্থী বসিয়ে দিয়ে এবং তথাকথিত ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের দল থেকে বহিষ্কার করে তারা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে। আচরণবিধির ৩ ধারায় বলা হয়েছে: ‘নির্বাচন প্রভাবমুক্ত রাখা: প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তাহার পক্ষে অর্থ, অস্ত্র ও পেশিশক্তি কিংবা স্থানীয় ক্ষমতা
দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনোভাবেই নির্বাচন প্রভাবিত করা যাইবে না।’ কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের নির্বাচন কমিশন ছিল এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্বিকার।
লক্ষণীয় যে দুই পর্বের নির্বাচনেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণের অনিয়ম ও কারচুপি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ‘কর্তৃপক্ষের সহায়তায়’ জাল ভোট দেওয়ার ও কেন্দ্র দখল করে সিল মারার অভিযোগ উঠেছে। অনেক জায়গায় মারামারি ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়েছে। প্রথম পর্বের তুলনায় দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে কারচুপির বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি বহু বছর পর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় পর্বে তিন ব্যক্তির প্রাণহানিও ঘটেছে।
উপজেলা নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অনিয়ম ও সহিংসতার ঘটনা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অবলোকন করা আবশ্যক। অতীতে সহিংসতা ছিল আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত চারটি সিটি করপোরেশন ও নয়টি পৌরসভা নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০১৩ সালের শেষ পর্যন্ত যত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তার সব কটিতেই, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। এসব নির্বাচনে—যার মধ্যে ছিল একটি জাতীয় নির্বাচন এবং কয়েক সহস্র স্থানীয় সরকার নির্বাচন—একজন ব্যক্তিরও প্রাণহানি ঘটেনি। তাই মনে হয়েছে যে নির্বাচনে কারচুপি ও সহিংসতার অভিশাপ থেকে যেন আমরা মুক্ত হয়েছিলাম। উল্লেখ্য, যে কয়টি নির্বাচনে বাড়াবাড়ি ঘটেছে, প্রায় সব কয়টি ক্ষেত্রেই বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মতো সাফাই না গেয়ে, শামসুল হুদা কমিশন প্রকাশ্যভাবে অসন্তোষ প্রকাশ ও তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল।
২০০৮-১৩ সালে অনুষ্ঠিত কয়েক হাজার নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হওয়ার কারণ ছিল মূলত তিনটি। প্রথমত, নির্বাচনী বিধিবিধানের কঠোরতা—২০০৮ সালে নির্বাচনী আইনে ব্যাপক সংস্কারের ফলে এ কঠোরতা অর্জিত হয়। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচনী বিধিবিধান প্রয়োগে কমিশনের দৃঢ়তা। তৃতীয়ত, নির্বাচনকালীন সরকারের মোটামুটি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন।
বর্তমান উপজেলা নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিধিবিধানে তেমন কোনো পরিবর্তনই ঘটেনি। সরকারের পক্ষ থেকেও চর দখলের মতো কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে বলে মনে হয় না—তাহলে ক্ষমতাসীন দল আরও অনেক ভালো করত—যদিও স্থানীয়ভাবে সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের বাড়াবাড়ির ক্ষেত্রে সরকার চোখ বুজে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেই আমাদের ধারণা। আমাদের আশঙ্কা যে চলমান উপজেলা নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা দেখা দিয়েছে, তার মূল কারণ বর্তমান নির্বাচন কমিশন।
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে আমাদের সংবিধান কমিশনকে রূপক অর্থে ‘নারীকে পুরুষ এবং পুরুষকে নারী করা ছাড়া’ প্রায় সব ক্ষমতাই দিয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনের দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়াও সেনাবাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্স কমিশনের কর্তৃত্বে ছিল। তা সত্ত্বেও দুষ্কৃৃতকারীরা কোনো কোনো এলাকায় ভোটকেন্দ্রে ঢুকে ব্যালট পেপারে সিল মারতে এবং মারমুখী আচরণ করতে সক্ষম হয়েছে। তাই মনে হয় যেন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সংবিধান প্রদত্ত অগাধ ক্ষমতার ব্যাপকতা কমিশনের সদস্যরা হয় অনুধাবন করতে পারছেন না, না হয় সে ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য তাঁদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নেই, অথবা তাঁরা অন্য কারও দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন। এসব কারণের যেটি বা যেগুলোই প্রযোজ্য হোক না কেন, কমিশন যে নিজেই উপজেলার ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা অনেক নাগরিকের কাছেই আজ সুস্পষ্ট।
অনেক বিষয়ই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করে, যার মধ্যে প্রার্থীর সুনাম-দুর্নাম ও যোগ্যতা-অযোগ্যতা, আঞ্চলিকতাসহ অন্যান্য স্থানীয় ইস্যু অন্যতম। তবে যেহেতু এবার দলীয় ভিত্তিতে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে এবং প্রধান দলগুলোর পক্ষ থেকে একক প্রার্থী দেওয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে, তাই উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল দলের জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে ধরে না নেওয়া গেলেও এটি থেকে বিভিন্ন দলের প্রতি জনসমর্থনের ব্যাপারে মোটামুটি একটি ধারণা পাওয়া যায়।
অনেকেরই স্মরণ আছে যে ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে শুরু করে গাজীপুর সিটি করপোরেশন পর্যন্ত যতগুলো সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়েছে, তার সবগুলোতেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। মনে হয় যেন চলমান উপজেলা নির্বাচনে এই পরাজয়েরই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। অর্থাৎ ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে মহাজোটের মহাবিজয়ের পর থেকে তাদের জনপ্রিয়তায় যে ভাটা পড়েছে, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমান উপজেলা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের ‘পরাজয়’ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র ।করে উভয় দলই ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিল। বিএনপি সমালোচিত হয়েছিল জামায়াতের সঙ্গে তাদের আঁতাত ও সহিংস আন্দোলনের কারণে। আর সরকারি দলের সমালোচনার কারণ ছিল বিতর্কিত ও একতরফা জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি তাৎপর্যপূর্ণ যে এত সমালোচনার পরও বিএনপি যেন উপজেলা নির্বাচনে তাদের ‘জনপ্রিয়তা’ অনেকটা ধরে রাখতে পেরেছে।
উপজেলা নির্বাচনী ফলাফল আরও তাৎপর্যপূর্ণ এ কারণে যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল স্বাভাবিকভাবেই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। প্রার্থীরা সাধারণত দাবি করেন যে যেহেতু তাঁদের দল ক্ষমতায় আছে, তাই তাঁদের ভোট দিলে বেশি হারে স্থানীয় উন্নয়ন হবে। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের এমপি ও নেতারা কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়েই থাকেন। তাই অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেই বিরোধী দল বর্তমান উপজেলা নির্বাচনে আশাতীতভাবে ভালো করেছে।
পরিশেষে, উপজেলা নির্বাচনে ক্রমবর্ধমান কারচুপি ও সহিংসতা আমাদের শঙ্কিত করছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা যদি কলুষমুক্ত না করা যায়, তাহলে দেশে শান্তি ফিরে আসবে না। বস্তুত, চলমান সহিংসতার কারণে দেশে নারকীয় পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আর এ পরিস্থিতিতে উগ্রবাদের বিস্তার ঘটাই স্বাভাবিক। তাই সরকার, রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনকে আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সব ধরনের বিতর্ক ও সহিংসতামুক্ত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, মার্চ ০৯, ২০১৪

No comments:

Post a Comment