Feb 26, 2014

বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে ড. বদিউল আলম মজুমদারের ‘সংবিধান সংশোধন, সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্রিক শাসন’ গ্রন্থ

গবেষক, উন্নয়নকর্মী ও সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের ‘সংবিধান সংশোধন, সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্রিক শাসন’ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবারের বাংলা একাডেমী বইমেলায়। গ্রন্থটি ২০ ফেব্র“য়ারি, ২০১৪ তারিখে প্রকাশিত হয়। আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত লেখকের এ গ্রন্থের দশটি অধ্যায়ে বাংলাদেশের রাজনীতি, সংসদ ও সংবিধান, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, দুর্নীতি ও সুশাসন সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখকের ৬১টি নির্বাচিত নিবন্ধ স্থান পেয়েছে। গ্রন্থের মূল্য রাখা হয়েছে সাত শ’ টাকা। এ পর্যন্ত লেখকের সাতটি গ্রন্থটি প্রকাশিত।

গ্রন্থের ভূমিকায়/প্রাক্কথনে বলা হয়:
গণতন্ত্র আমাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার। আমাদের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’
অর্থাৎ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত যে কোনো সরকারের জন্যই গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়াও উচ্চ আদালত গণতন্ত্রকে আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, ফলে আমাদের সংবিধান থেকে গণতন্ত্র সম্পর্কিত বিধানগুলো কারও পক্ষে বাদ দেওয়াও সম্ভব নয়।

গণতন্ত্র মানে জনগণের সম্মতির শাসন। গণতান্ত্রিক শাসনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট হলো, এর মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক তথা শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা রদবদলের পথ রুদ্ধ হলে অশান্ত পরিস্থিতিতে, এমনকি  সহিংসভাবে তা ঘটতে বাধ্য। কারণ নিয়মতান্ত্রিকতার শেষ যেখানে, সহিংসতার শুরুই সেখানে।

আর সত্যিকারের জনগণের সম্মতি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রের সর্বস্তরে জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে, শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নয়। অর্থাৎ এমপি-মন্ত্রী বানানোর নির্বাচন সম্পন্ন হলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। আর এ লক্ষ্যে আমাদের সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্নয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ অর্থাৎ আমাদের সাংবিধানিক নির্দেশনা হলো স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা করা [কুদরত-ই-ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ, ডিএলআর ৪৫(এসি)(এডি)১৯৯২]। অন্যভাবে বলতে গেলে, আমাদের সংবিধানিক নির্দেশনা আনুযায়ী, জেলায় নির্বাচিত জেলা পরিষদ, উপজেলায় নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়নে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ শাসনকার্য পরিচালনা করবে। (আইনের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাকে ‘প্রশাসনিক একাংশ’ হিসেবে ঘোষণা করায়, সকল সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভায়ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা করা বাধ্যতামূলক।) শাসনকার্য পরিচালনা মানে শুধুমাত্র ছোটখাট বা বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত কিছু কার্য সম্পাদন নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ে সব কিছু ব্যবস্থাপনা করা।

শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা Ñ যেমন, একদল নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং তাদের থেকে মনোনীত একদল মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী শাসনকার্য পরিচালনা করলে তা হয়ে পড়ে নিতান্তই আংশিক বা অপূর্ণ গণতন্ত্র। বস্তুত স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর স্থানীয় সরকার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত না হলে, কেন্দ্রের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনকে ফানুসের মত শূন্যে ‘ঝুলন্ত’ বা ‘খুঁটিহীন’ গণতন্ত্র বললে অত্যুক্তি হয় না। কারণ কেন্দ্রের বাইরে প্রশাসনের সকল স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য খুঁটি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু খুঁটিহীন গণতন্ত্র সত্যিকারের গণতন্ত্র নয়, বরং তা গণতন্ত্রের বিকৃত রূপ। আর আংশিক বা বিকৃত গণতন্ত্র টিকেই থাকে না, এর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের তো প্রশ্নই আসে না।

দুর্ভাগ্যবশত আমাদের বাহাত্তরের সংবিধানের ৯, ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে (সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালের জুন মাসে ১১ অনুচ্ছেদের স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত অংশটুকু বাদ দেওয়া হয়) প্রশাসনের সকল স্তরে ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন’ প্রতিষ্ঠার বলিষ্ঠ নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। তা সত্ত্বেও স্বাধীনতা অর্জনের পর গত ৪২ বছরেও বাংলাদেশে জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। বরং সংবিধানের প্রশাসনের সকল স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা উপেক্ষা করে ২০১১ সালে দলীয় ব্যক্তিদের জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংবিধানকে উপেক্ষা করে দীর্ঘ ১৮ বছর পর ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও, এটিকে এখনও অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। বস্তুত সংবিধান লঙ্ঘন করে ও উচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে সম্পূর্ণ কোটারি স্বার্থে এটিকে অর্থহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় তিন বছর পর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনগুলো বহুলাংশে সময়মত হলেও গত সাত বছর ধরে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঝুঁলে আছে। এ ছাড়াও নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবর্তে, ঢাকা মহানগরকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে এবং জনমত উপেক্ষা করে বিভক্ত করা হয়েছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের অভাবে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অকার্যকর থেকে যাচ্ছে এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।

গণতান্ত্রিক শাসনের সূচনা হয় নির্বাচনের মাধ্যমে Ñ সর্বস্তরে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য না হলে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না। নির্বাচন পরবর্তীকালে নির্বাচিত সরকার গণতান্ত্রিক আচরণ করলে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলেই সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম হয়।  নির্বাচন অসচ্ছ ও পাতানো হলে বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি এর ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙেও পড়তে পারে। তবে নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের সূচনা হয় মাত্র। নির্বাচন পরবর্তীকালে নির্বাচিত সরকার গণতান্ত্রিক আচরণ করলে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলেই সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম হয়।

দুর্ভাগ্যবশত, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক রীতিনীতির চর্চার অভাব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুরবস্থা এর জন্য মূলত দায়ী। দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের ব্যাপকতা, নির্বাচিত সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার অভাব এবং অন্যায় করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিও এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এমনি প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য নির্দলীয় ব্যক্তিদের নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি উঠে। বহু আন্দোলন-সংগ্রামের এবং একটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আমাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীতে একটি একতরফা সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালে আমাদের সংবিধান থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান বাদ দেওয়া হয়। এসব ও এর আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোই বর্তমান গ্রন্থের দশটি অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে।

গ্রন্থে প্রকাশিত লেখাগুলো পড়ে এবং তথ্যগুলো জেনে যদি পাঠকরা বাংলাদেশের রাজনীতি, সংসদ ও সংবিধান, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, দুর্নীতি ও সুশাসন সম্পর্কে চিন্তার খোরাক পান তাহলেই আমার প্রচেষ্টা এবং এ গ্রন্থ প্রকাশ স্বার্থক হবে।

প্রতিবেদক: নেসার আমিন, সুজন সচিবালয়।

No comments:

Post a Comment