Oct 27, 2013

কোন সংবিধান, কার সংবিধান?

গত ১৮ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে তিনি সংবিধান থেকে একচুলও নড়বেন না। তবে গত কয়েক দিনের ঘটনাবলি থেকে তাঁকে কিছুটা নমনীয় মনে হয়েছিল। ১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বিরোধী দলকে নিয়ে নির্বাচনকালীন একটি সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। যদিও প্রস্তাবটি নতুন নয়—১ আগস্ট ২০১২ তারিখে বিবিসি বাংলা সার্ভিস প্রচারিত সাক্ষাৎকারে তিনি একই বক্তব্য রাখেন এবং ১৯৯৫ সালে স্যার নিনিয়ানের একই ধরনের প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেন—তবু এতে অনেক আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে একটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে সংলাপ শুরুর জন্য আওয়ামী লীগকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়ার এবং দুই দলের মহাসচিবের ফোনালাপের পর মনে হয়েছিল যে দুই প্রতিপক্ষের মধ্যকার বরফ গলা শুরু হয়েছে।
কিন্তু এর পরই প্রধানমন্ত্রী দিনাজপুরের জনসভায় সংবিধানের বাইরে কোনো প্রস্তাব মানবেন না বলে ঘোষণা দেন। ২৩ অক্টোবর বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদে উপস্থিত হয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তাঁদের প্রস্তাব উত্থাপনের পর সৃষ্ট অনির্ধারিত বিতর্কে সরকারি দলের পক্ষ থেকে একইভাবে সংবিধানের দোহাই দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী ও সরকারি দলের পক্ষ থেকে কোন সংবিধানের কথা বলা হচ্ছে? নিঃসন্দেহে তাঁরা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কথা বলছেন, যার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করা হয়। আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় সংবিধানকে জনগণের ‘এমবডিমেন্ট অব দ্য উইল’ বা ‘অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিস্বরূপ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আসলেই কি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন? নাকি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তেরই ফসল? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য সংশোধনীটি পাসের ইতিহাস খতিয়ে দেখা আবশ্যক।
স্মরণ করা যেতে পারে, জাতীয় সংসদে ২১ জুলাই ২০১০ প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবক্রমে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে চেয়ারপারসন এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে কো-চেয়ারপারসন করে মহাজোটের অংশীদারদের মধ্য থেকে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়। বিরোধী দলকেও কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়, যা তারা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। কমিটি ২৭টি বৈঠক করে এবং তিনজন প্রধান বিচারপতি, ১০ জন আইনজীবী/বিশেষজ্ঞ, আওয়ামী লীগসহ ছয়টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি (যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও জেনারেল এরশাদ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন), ১৮ জন বুদ্ধিজীবী, ১৮ জন সম্পাদক এবং সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সদস্যদের মতামত গ্রহণ করে। কী ঘটেছিল এসব সভায়?
বিশেষ কমিটির ২৯ মার্চ ২০১১ তারিখের ১৪তম সভায় ‘বিদ্যমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অপরিবর্তিত রাখার বিষয়ে ঐকমত্য হয়’। একই সময়ে এ ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী বৈঠকে আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়।
উপরিউক্ত বৈঠকে ঐকমত্য তৈরির ক্ষেত্রে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের বক্তব্য অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। যেমন, তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেজর কোনো কিছুতে হাত দেওয়া আমাদের কোনোমতেই উচিত হবে না। ... যদি দুই টার্মের জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়, তা হলে দেখা যাবে যে ওই দুই টার্মের পর হয়তো আমাদের ক্ষমতাসীনদের অধীনে নির্বাচন করতে হবে। তখন আমাদের চিৎকার করতে হবে... এই সময় এর মধ্যে আমাদের যাওয়াটা ঠিক হবে না।’
আমির হোসেন আমু বলেন, ‘আসলে আমরা যদি এটা পরিবর্তন করতে যাই, তাহলে অনেক complication arise করবে, অনেক ঝামেলার মধ্যে আমরা জড়িয়ে পড়ব। তার চেয়ে it is better, এটা যেভাবে আছে, সেভাবে থাক। তবে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আরেকটি কথা বলেছেন, তিন মাস সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া।’
আবদুল মতিন খসরু বলেন, ‘আমরা যখন প্রথম বৈঠকে বসি, তখন কতগুলো নীতিমালা নিয়েছিলাম যে আমরা এমন কোনো বিষয়ে যাব না, যাতে বিতর্কে জড়িয়ে যাই। আমরা বিতর্কিত কোনো বিষয়ে হাত দেব না। আমি বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে ব্যবস্থা আছে, এটাই থাকুক।’
রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘মাননীয় সদস্য, আপনি যেটা বললেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পর্যন্ত ঠিক আছে।’
শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘আমিও একমত যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে আমাদের কোনো পরিবর্তন এই মুহূর্তে প্রয়োজন নেই। যদি সময়টা limit করার বিষয় থাকে, তাহলে সে ব্যাপারে হয়তো আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘In spite of all the limitation এটাকে রেখেই আগানো ভালো। এটার ওপরেই একটি ঐকমত্যে আমরা যাই। তার পরে loopholes গুলোতে যাব।’
কমিটির ২৭ এপ্রিল ২০১১ তারিখের ২০তম সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘... অনির্বাচিত ও অগণতান্ত্রিক সরকার আর কেউ দেখতে চায় না। আর ৫৮-এ একটি সুযোগ থাকায় ওই ফাঁক দিয়ে আবার অন্য কিছু ঢুকে যাওয়া। তাই ৫৮ অনুচ্ছেদকে একটু সংশোধন করে ওই সুযোগটা যাতে আর না থাকে, (তা) বন্ধ করে একটি টাইম ফ্রেম দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।’ লক্ষণীয় যে প্রধানমন্ত্রী কমিটির সামনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংস্কারের সুপারিশ করেছেন, এটি বাতিলের নয়।
একই সভায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ত্রয়োদশ সংশোধনী সম্পর্কে আমার বক্তব্য... হচ্ছে... এটি (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) আমরা রাখব।’
এরপর ১০ মে, ২০১১ তারিখে প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ (৪-৩) বিচারকেরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক বলে একটি সংক্ষিপ্ত আদেশ দেন। একই আদেশে জনগণ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে এই ব্যবস্থাকে আরও দুই টার্মের জন্য রাখার পক্ষে পর্যবেক্ষণ দেন। আরও পর্যবেক্ষণ দেন, নির্বাচনের ৪২ দিন আগে সংসদ বিলুপ্ত করার।
আদালতের এই সংক্ষিপ্ত আদেশের পর ২৯ মে ২০১১ তারিখে কমিটি সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি লিখিত সুপারিশ তৈরি করে। সুপারিশে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়, ‘সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮খ-এর সংশোধন। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮খ-এর দফা (১)-এ “মেয়াদে” শব্দের পর “অনধিক নব্বই দিনের জন্য” শব্দগুলো সন্নিবেশিত হইবে... “সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮ঘ-এর সংশোধন। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮ঘ-এর দফা (২) এরপর নিম্নরূপ নতুন দফা (৩) সংযোজিত হইবে। যথা—(৩) নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার অন্য কোনো রাষ্ট্র, দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো বিদেশি নাগরিকের সহিত কোনো প্রকারের নতুন চুক্তি সম্পাদন করিবেন না, তবে ইতিপূর্বে সম্পাদিত কোনো চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করিতে পারিবেন এবং এইরূপ মেয়াদ বৃদ্ধি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ অবসানের অব্যবহিত পরে গঠিত সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হইতে হইবে।’ (ওপরের সব উদ্ধৃতিই বিশেষ কমিটির সভার কার্যবিবরণী থেকে নেওয়া।)
লক্ষণীয় যে উচ্চ আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশের পরও এর মেয়াদ ৯০ দিনের মধ্যে সীমিত করে এবং বৈদেশিক চুক্তির ক্ষেত্রে পরবর্তী সংসদে এটি অনুমোদনের বিধান রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে বহাল রাখার পক্ষে কমিটি সর্বসম্মতভাবে সুপারিশ করে। আরও লক্ষণীয় যে কমিটির ১৫ জন সদস্যই মহাজোটের অন্তর্ভুক্ত।
উপরিউক্ত সুপারিশ প্রণয়নের পরদিন অর্থাৎ ৩০ মে কমিটির সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তী ঘটনাবলি ইতিহাসের অংশ। ২০ জুন আদালতের পূর্ণ রায় লেখার আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বিধানসংবলিত সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত একটি বিল মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে, যা ২৫ জুন সংসদে উত্থাপন করা হয়। এরপর ৩০ জুন সংসদে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংশোধনীটি পাস হয়। এ ইতিহাস থেকে পাঠকেরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কি বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনগণের অভিপ্রায়ের, না প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার প্রতিফলন! বলা বাহুল্য যে এ সিদ্ধান্তের কারণেই আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, হানাহানি ও নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা।
প্রসঙ্গত, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে একক ইচ্ছায় তো দূরের কথা, সংবিধান সংশোধনই প্রায় অসম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য কর্তৃক পাসের পর তিন-চতুর্থাংশ অঙ্গরাজ্য কর্তৃক সেই সংশোধনী অনুমোদন করতে হয়। এ ধরনের বাধানিষেধের কারণে ১৯৯২ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে কোনো পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। এমনকি সেই দেশে নারী-পুরুষের সমতা-সম্পর্কিত ‘ইকুয়েল রাইটস অ্যামেন্ডমেন্ট’ও একাধিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পাস হয়নি।
উল্লেখ্য, শুধু পঞ্চদশ সংশোধনীর লেজিটিমেসিই নয়, এর আইনি বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ। সংশোধনীটির মাধ্যমে (অনুচ্ছেদ ৭বি) সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশকেই অপরিবর্তনযোগ্য করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু কোনো সংসদই পরবর্তী সংসদের হাত-পা বেঁধে দিতে পারে না (মাহমুদুল ইসলাম, কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ, তৃতীয় সংস্করণ, পৃ-৩১)।

সূত্র: প্রথম আলো, ২৮ অক্টোবর, ২০১৩

No comments:

Post a Comment