Oct 25, 2013

সংলাপে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ স্বাগত

দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের অনড় অবস্থানের কারণে আমরা এক রাজনৈতিক শৈত্যের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। গত কয়েক দিনে হঠাৎই যেন সেই বরফ গলতে শুরু করেছে। এর সূচনা হয়েছে গত ১৮ অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দেন তার মধ্য দিয়ে। তিনি সেই ভাষণের মাধ্যমে একটি সর্বদলীয় সরকারের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তাব দেন এবং নির্বাচনকালীন ওই সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য বিরোধী দল থেকে মনোনীত এমপিদের নাম দেওয়ার আহ্বান জানান। যদিও তার প্রস্তাব নাগরিক সমাজে আশার সঞ্চার করেছিল, বিষয়টি কিন্তু নতুন নয়।
আমাদের মনে আছে, তিনি ২০১২ সালে বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে একই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবুও জাতির উদ্দেশে ভাষণের মধ্য দিয়ে এ ব্যাপারে তিনি বিরোধী দলকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিলেন_ এই বিষয়টিই ইতিবাচক। এটা ঠিক যে, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান কে থাকবেন, সে বিষয়ে তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। কিন্তু আমরা স্বস্তির সঙ্গে দেখলাম যে, গোটা বক্তব্যে গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে। বিরোধী দলের প্রতি আক্রমণাত্মক ভাষাও ছিল না।
আমরা দেখেছি, প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী দলও নেতিবাচক অবস্থানে নেই। অতীতের মতো ভাষণ শুনেই প্রত্যাখ্যান করেনি। তারা বরং সময় নিয়েছে। পরের দু'দিন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নিজেদের স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা করেছে, ১৮ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে আলোচনা করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেনি। বরং নিজেদের দিক থেকে একটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেত্রী এ বিষয়ে যে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানেও দেখা গেছে তিনি আক্রমণাত্মক হননি। মঙ্গলবার দেখা গেল দুই দলের মধ্যে প্রস্তাব নিয়ে চিঠি চালাচালিও শুরু হয়েছে। প্রকাশ্যই ফোনে কথা হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের কাছে চিঠি লিখেছেন। সেই চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে তৎক্ষণাৎ ফোন দিয়েছেন। একটি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকা অবস্থায় ফোনটি এসেছিল, তাদের মধ্যে কথোপকথন, পারস্পরিক সৌজন্যবোধ সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে দেশবাসী ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন।
দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে এই প্রস্তাব বিনিময় ও গঠনমূলক অবস্থান আমাদের সত্যিই আশাবাদী করে তোলে। কারণ কয়েক সপ্তাহ আগেও যেন মনে হচ্ছিল, সংলাপ এক সুদূরপরাহত বিষয়। দুই দলের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হওয়ার নূ্যনতম সম্ভাবনাও ছিল না। বিশেষত সরকার পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছিল, সংসদের বাইরে সংলাপ হতে পারে না। বিরোধী দলকে যা বলার সংসদে এসে বলতে হবে। মনে আছে_ ১৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর শাহাদত দিবসে যিনি কেক কেটে উৎসব করেন, তার সঙ্গে কিসের আলোচনা? ক্ষমতাসীন গলের অন্যান্য নেতাও সংলাপের ব্যাপারে নেতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, সংবিধানে যা আছে সে অনুযায়ীই নির্বাচন হবে। সেখান থেকে তিনি একচুল নড়বেন না। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেত্রীও অত্যন্ত কড়া ভাষায় প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থানের সমালোচনা করেছিলেন। হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, গণআন্দোলনের মুখে সরকারকে দাবি মেনে নিতে হবে। এখন দুই পক্ষই সমঝোতার পথে পা বাড়িয়েছে বলে মনে হচ্ছে। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের এই অবস্থান দেশের সাধারণ নাগরিকদের নিশ্চয়ই স্বস্তি দিয়েছে।
অবশ্য অনেকে বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অসম্পূর্ণ, অস্পষ্ট। বিশেষ করে সরকার প্রধান কে হবেন, সে বিষয়ে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রী ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ, ওই দুই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের কয়েকজন ইতিমধ্যে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। যারা বেঁচে আছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ শারীরিকভাবে অক্ষম। কয়েকজন সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে ফের কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারে যোগদানের ব্যাপারে অনাগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু আমি দুই প্রস্তাবকেই ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। আমি মনে করি, এগুলো সংলাপের প্রাথমিক ধাপ। দুই প্রস্তাব নিয়ে এখন আলাপ-আলোচনা শুরু হতে পারে। সদিচ্ছা থাকলে এখান থেকেই কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো একটি সমাধানে পেঁৗছতে পারে।
সবাইকে মনে রাখতে হবে, কোনো সমস্যার সমাধান নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সদিচ্ছার ওপর। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সমাধান করতে চায়, তাহলে সমাধান কঠিন ব্যাপার নয়। অতীতে আমরা দেখেছি, যখনই রাজনৈতিক দলগুলো আন্তরিক হয়েছে সমাধান তখনই সম্ভব হয়েছে। নাগরিক সমাজের দিক থেকে আমাদের দাবি হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোই যেন রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করে। তাদেরই করতে হবে। কারণ রাজনৈতিক এই অনিশ্চয়তা, পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতার এই সমস্যা নাগরিকরা সৃষ্টি করেনি। নাগরিক সমাজ সুশাসন চায়, উন্নয়ন চায়, সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়, সন্দেহ নেই। কিন্তু সে ধরনের পরিবেশ রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিশ্চিত করতে হবে। তাদেরই রাজনৈতিক সব ধরনের সমস্যার সমাধান করতে হবে।
এই যে এখন পরস্পরের মধ্যে আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, এতে আমরা সবাই স্বস্তিবোধ করছি। সব নাগরিকের মধ্যেই এ নিয়ে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এরপরও যদি সমস্যার সমাধান না নয়, যদি আলোচনার নামে টালবাহানা চলে, যদি দুই দল ওয়ান-ইলেভেনের আগের মতো সংলাপ সংলাপ খেলা করে, এসব চিঠি চালাচালি যদি লোক দেখানো হয়, তাহলে জনগণ আরও হতাশ হবে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে যদি শ্রদ্ধা দেখানো না হয়, তাহলে রাজনীতিবিদদের প্রতিও সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা কমে যাবে।
আমরা জানি, দুই দলের মধ্যে মতৈক্যের প্রধান অন্তরায় দুই দলই জিততে চায়। দুই দলই ক্ষমতার রাজনীতি করে। এই রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ক্ষমতা নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করা। এভাবে ক্ষমতায় গিয়ে সরকার অনুগতদের নানারকম ফায়দা দেয়, নিজেরাও নেয়। অন্যায় করেও পার পেয়ে যায়। ক্ষমতায় যাওয়ার সঙ্গে এগুলোর রয়েছে প্রবল আকর্ষণ। অন্যদিকে ক্ষমতায় যেতে না পারার ভীতিও কম নয়। বিপুল ক্ষমতা ও সম্পদ থেকে বঞ্চিত হওয়া তো আছেই, ক্ষমতায় যেতে না পারলে পরাজিত দলকে পাঁচ বছরের জন্য মামলা, হামলা মেনে নিতে হয়। ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়ার সঙ্গে যেন অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত। তাই যে কোনো মূল্যেই জিততে চায়। ফলে যখন সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রশ্নে ছাড় দেওয়ার কথা হয়, তখন তাদের জন্য নমনীয় হওয়া সহজ নয়।
ছাড় দেওয়া দ্বিতীয় 'সমস্যা' হচ্ছে মাঠের রাজনীতির হিসাব। রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে, নির্বাচনের দোরগোড়ায় গিয়ে যারা ছাড় দেবে, তারা মাঠের রাজনীতিতে পরাজয় বরণ করতে পারে। এমনকি প্রতিপক্ষ বিজয় মিছিল করতে পারে। এর প্রভাব নির্বাচনে পড়বে। ফলে কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। নির্বাচনের আগেই বিজয় লাভ করতে চায়। তা সত্ত্বেও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করার বিকল্প নেই। সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে যথাসময়ে ও সুষ্ঠুভাবে সাধারণ নির্বাচন হতেই হবে।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, সরকারপ্রধান কে হবেন, এসব প্রধান সমস্যা সন্দেহ নেই। কিন্তু এগুলোই শেষ নয়। সুস্থ রাজনীতি, সহনশীল পরিবেশ ও সুশাসনের প্রশ্নে আরও কিছু বিষয় মীমাংসা করতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রশাসনে দলীয়করণ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে দলীয়করণ দূর করার ব্যাপারে দুই পক্ষের মধ্যে মতৈক্য হতে হবে। দলীয় অনুগত ও আশীর্বাদপুষ্টদের স্বপদে রেখে সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন কি সম্ভব? আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি, নির্বাচন কমিশনও কিছু অহেতুক বিতর্ক তৈরি করেছে। এর ফলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই কমিশনের ব্যাপারে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। সুতরাং কমিশনের ব্যাপারেও মতৈক্যে পেঁৗছতে হবে। নির্বাচন কমিশন যদি নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে না পারে, যদি যোগ্যতা প্রদর্শন করতে না পারে, যদি কার্যকারিতা প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন কীভাবে সম্ভব?
এখন যে সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, আমি চাই সেই সংলাপে বা আলোচনায় শুধু নির্বাচনকালীন সরকার নয়, শুধু নির্বাচনী বিধিবিধান ও আচার-আচরণে নয়; নির্বাচিত হওয়ার পর সরকার গঠন করতে পারলে গণতন্ত্র ও সুশাসন টেকসই করতে রাজনৈতিক দলগুলোর পরিকল্পনা কী তা-ও বলতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যতে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য কী কী পদক্ষেপ নেবে সে ব্যাপারেও রাজনৈতিক দলগুলোকে কথা বলতে হবে। আমরা চাই, শুধু একটি নির্বাচনের জন্য সমাধান নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কথা রাজনৈতিক দলগুলোর চিন্তা করা দরকার। প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত করে জাতীয় সনদ প্রণয়ন ও স্বাক্ষর করা যেতে পারে। ১৯৯০ সালে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর তিন জোটের মধ্যে এ ধরনের রূপরেখা তৈরি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রধান দুই দলের পাশাপাশি অন্যান্য দলকেও সঙ্গে নিতে হবে।
আমি আশা করি, অতীতে নানা অনিশ্চয়তা ও নেতিবাচক অবস্থান সত্ত্বেও সামনের দিনগুলোতে রাজনীতিবিদরা প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টির পরিচয় দেবেন। ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করবেন। সবাইকে আন্তরিক হতে হবে, যাতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। যাতে আরেকবার ওয়ান-ইলেভেনের মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়। হানাহানি সত্ত্বেও গত কয়েক বছর ধরে আমরা যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছি, তা যেন অব্যাহত থাকে।

সূত্র: সমকাল, ২৩ অক্টোবর, ২০১৩

No comments:

Post a Comment