Sep 16, 2013

রাজনৈতিক সংকট- পথ বেছে নেওয়ার দায়িত্ব দুই নেত্রীরই

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আজ আমাদের সামনে তিনটি সুস্পষ্ট সম্ভাবনা বা আশঙ্কা দৃশ্যমান। প্রথমত, আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন করা। তবে এর মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হওয়া দুরূহ।
দ্বিতীয়ত, রাজপথে হরতাল-অবরোধের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন, এমনকি তা প্রতিহত করার চেষ্টা করবে, যা সহিংসতায় রূপ নিতে বাধ্য। তবে রাজপথের সহিংস আন্দোলনের মুখে নির্বাচন করা সম্ভব হলেও, সেটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
রাজপথের সহিংস আন্দোলন অবশ্য বেসামাল পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে, যার ফলে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আবারও ভেঙে পড়তে এবং অনির্বাচিত ব্যক্তিরা ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেন। তাই রাজপথের অনিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে সাধারণত সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না, বরং তা আরও ব্যাপক, জটিল ও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, সমস্যার স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের কথা ভাবা, যে সমাধান শুধু সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তাই দেবে না, বরং আমাদের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে ভূমিকা রাখবে। এ জন্য অবশ্য প্রয়োজন হবে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ অন্য স্বার্থসংশ্লিষ্টদের নিয়ে আরও বৃহত্তর পরিসরে সংলাপ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জাতীয় মতৈক্য গড়ে তোলা এবং একটি ‘জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন ও স্বাক্ষর করা।
প্রসঙ্গত, অনেকের ধারণা যে উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায় প্রকাশের আগেই তড়িঘড়ি করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল ছিল মহাজোট সরকারের এক মহা ভুল। এর পরিণতিতে বিএনপির ‘জামায়াতীকরণ’ হয়েছে এবং উগ্রবাদ প্রতিষ্ঠার পথে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। লক্ষণীয়, বিএনপি যখনই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলনের উদ্যোগ নিয়েছে বা সরকারের অন্য কোনো অন্যায় কর্মের প্রতিবাদ করেছে, তখনই তাদের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার ভন্ডুল করার অভিযোগ তোলা হয়েছে, যা বস্তুত তাদের জামায়াতের কোলে ঠেলে দিয়েছে। আন্দোলনের স্বার্থেও বিএনপি অবশ্য জামায়াতের ঘনিষ্ঠ হয়েছে। আর এমনই এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছে। অনেকের ধারণা যে জামায়াতের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর লক্ষ্যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সামনে আনা হলেও, বিএনপি পরবর্তী সময়ে হেফাজতকে ‘ছিনতাই’ করেছে। এ অবস্থায় বর্তমানে জামায়াত, হেফাজত আর বিএনপিকে এক কাতারে দাঁড় করানো এবং বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছার ব্যাপারে অনীহা ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে আরেকটি পর্বতপ্রমাণ ভুল বলে অনেকের আশঙ্কা। কারণ, জামায়াত-হেফাজত-বিএনপি বাংলাদেশকে উগ্রবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করতে এক কাতারে দাঁড়ালে তা ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হবে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, অনৈতিকতার পরিণতি অশুভ, যার আলামত সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান এবং দুর্ভাগ্যবশত এর মাশুল পুরো জাতিকেই ভবিষ্যতে দিতে হতে পারে।
বিরাজমান অচলাবস্থা দূরীকরণের লক্ষ্যে কয়েক মাস আগে টিআইবি ‘নির্বাচনকালীন সরকার’-এর (ইটিজি) একটি রূপরেখা উত্থাপন করে। রূপরেখায় আমাদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক জোটের থেকে সমসংখ্যক সাংসদ নিয়ে একটি ‘পার্লামেন্টারি কনসেন্সাস কমিটি’ (পিসিসি) গঠনের প্রস্তাব করা হয়। পিসিসি নির্বাচনকালীন সরকারের জন্য ১১ সদস্যের নাম প্রস্তাব করবে, যার একজন হবেন এর প্রধান। উভয় পক্ষ থেকে পাঁচজনকে নিয়ে অথবা অতীতের কয়েকটি নির্বাচনে ভোট প্রাপ্তির গড় হারের ভিত্তিতে বাকি ১০ জন মনোনয়ন পাবেন। প্রস্তাবে ইটিজির ১০ সদস্য মনোনয়নের লক্ষ্যে তিনটি বিকল্পের কথা বলা হয়: বর্তমান সাংসদদের মধ্য থেকে (যার প্রধান হবেন একজন নির্দলীয় ব্যক্তি); সাংসদ এবং সংসদের বাইরের নির্দলীয় ব্যক্তিদের মধ্য থেকে; অথবা শুধু নির্দলীয় ব্যক্তিদের মধ্য থেকে।
এর আগে ড. আকবর আলি খানও নির্বাচনকালীন সরকার গঠন সম্পর্কে দুটি প্রস্তাব দেন। তিনি সুপ্রিম কোর্ট থেকে গত পাঁচ বা ১০ বছরের মধ্যে অবসরে যাওয়া বিচারপতিদের মধ্য থেকে একজনকে লটারির মাধ্যমে অথবা ১৫-২০ জনের একটি তালিকা থেকে একজনকে উভয় পক্ষের সম্মতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এর জন্য অবশ্য সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে। সংবিধানের ভেতর থেকে সরকারি দল থেকে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া চারজন মন্ত্রী এবং বিরোধী দল থেকে পাঁচজন মন্ত্রী ঠিক করা যেতে পারে। এক পক্ষ আরেক পক্ষের মন্ত্রীদের নির্বাচন করবে।
এসব প্রস্তাব কার্যকর করতে হলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে উভয় পক্ষের সদিচ্ছা লাগবে, যা এখন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বিশেষত, সরকারি দল বিভিন্ন অজুহাতে সংলাপের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে বলেও অনেকে মনে করেন, যদিও ‘বল’ এখন মূলত তাদেরই কোর্টে। আর আমাদের আশঙ্কা যে টিআইবি প্রস্তাবিত পিসিসি গঠন করা সম্ভব হলেও ইটিজি মনোনয়নের ক্ষেত্রে তারা মতৈক্যে পৌঁছাতে পারবে না। এ ছাড়া ১০ জন দলীয় ব্যক্তি এবং একজন নির্দলীয় প্রধানকে নিয়ে গঠিত ইটিজি হবে সম্পূর্ণ অকার্যকর।
তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্যের অভাব থাকলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে একধরনের মতৈক্য বর্তমানে বিরাজ করছে। নাগরিকদের অনেকেই চান:
যথাসময়ে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে এবং সবার অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।
নির্বাচনকালীন ৯০ দিনের জন্য একটি নির্দলীয় সরকার গঠিত হোক, যার দায়িত্ব হবে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত এবং নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিমতো সংসদ ২৭ অক্টোবরের আগেই বিলুপ্ত করা হোক। প্রসঙ্গত, সুপ্রিম কোর্টের রায়েও নির্বাচনের ৪২ দিন আগে সংসদ বিলুপ্তি সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণ রয়েছে। দ্য ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সামপ্রতিক (১৮ মে ২০১৩) সাক্ষাৎকারে বিচারপতি খায়রুল হক নির্বাচনের আগে বর্তমান সংসদ বিলুপ্তির লক্ষ্যে আরেকবার সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ জোর দেন।
নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর ও শক্তিশালী করা হোক, যার জন্য নির্বাচনী আইনে কিছু পরিবর্তন করা আবশ্যক। অনেকে অবশ্য মনে করেন যে কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার জন্য বর্তমান কমিশনের পুনর্গঠনের প্রয়োজন পড়বে।
রাজনৈতিক দলগুলো আইনকানুন, বিশেষত নির্বাচনী বিধিবিধান (যেমন, দলে গণতন্ত্রচর্চা, অঙ্গসংগঠনের বিলুপ্তি ইত্যাদি) মেনে চলুক, তারা অসৎ ও অযোগ্য ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়া থেকে বিরত থাকুক এবং মনোনয়ন-বাণিজ্য পরিহার ও নির্বাচনকে টাকার খেলায় পরিণত না করুক।
সর্বোপরি, রাজনীতিবিদেরা সংলাপের মাধ্যমে বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান করুক, যাতে সংঘাত এড়ানো যায় এবং নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়।
প্রসঙ্গত, ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক চূড়ান্ত রায় প্রকাশের আগেই সরকারের সংবিধান সংশোধনের সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই তাঁর রায়ের অংশবিশেষ গ্রহণ করার কারণেই বর্তমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর রায়ের আওতায় সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে রাখা যায় বলেও তিনি দাবি করেন, যদিও তিনি নিজে তা গ্রহণে অনাগ্রহী। সাক্ষাৎকারে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের তাগিদ দেন।
যেহেতু সরকার সংবিধান সংশোধন করবে না, তাই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই সংলাপের মাধ্যমে এখন সমস্যার সমাধান বের করতে হবে। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নির্বাচনকালীন সরকারের নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই নির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়েই নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হতে হবে।
বিরাজমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে একটি নির্বাচিত ও কার্যকর নির্বাচনকালীন সরকার দুভাবে গঠিত হতে পারে। এর একটি হতে পারে মতৈক্যের ভিত্তিতে দলনিরপেক্ষ ১১ জন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে তাঁদের নির্বাচিত করে এনে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা। এ জন্য অবশ্য সমসংখ্যক বর্তমান সাংসদদের পদত্যাগ করতে হবে।
দ্বিতীয় বিকল্প হতে পারে সরকারি ও বিরোধী দলের সাংসদদের মধ্য থেকে পাঁচজন করে ১০ জন এবং নির্দলীয় ব্যক্তিদের মধ্য থেকে আরও পাঁচজনকে নিয়ে মোট ১৫ সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা। এ ক্ষেত্রেও নির্দলীয় ব্যক্তিদের নির্বাচিত করে আনতে হবে।
উভয় ক্ষেত্রেই নির্বাচনকালীন সরকারের মেয়াদ হবে ৯০ দিন এবং নির্বাচন কমিশনকে সহায়তার বাইরে সরকারের রুটিন কার্যক্রমে নিজেদের তাঁরা সীমাবদ্ধ রাখবেন। সরকারের উপদেষ্টাদের কেউই আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না।
একটি অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে এসব ব্যক্তিকে মনোনীত করা যেতে পারে। আমাদের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিদের নিয়ে এই অনুসন্ধান কমিটি গঠিত হতে পারে এবং সবার জ্যেষ্ঠ সাবেক প্রধান বিচারপতি কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। অনেকেরই স্মরণ থাকতে পারে যে বর্তমান লেখক সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটির সামনে এমন একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন।
পরিশেষে, এটি সুস্পষ্ট যে জাতি হিসেবে আজ আমরা এক ক্রসরোডে অবস্থান করছি। আমাদের একদিকে রয়েছে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ এবং সবার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তোরণ, অন্যদিকে রয়েছে একদলীয় নির্বাচন করার মাধ্যমে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আবারও খাদে ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা। অনেকের আশঙ্কা যে বিরোধী দলের বর্জনের মুখে একতরফা নির্বাচনের ফলে সারা দেশে সহিংসতা ছড়াবে এবং জাতি হিসেবে আমরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হব, যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হবে একটি অকার্যকর, এমনকি উগ্রবাদী রাষ্ট্র। তাই আমাদের দুই নেত্রীকে আজ ঠিক করতে হবে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের ‘লিগেসি’ বা উত্তরাধিকার তাঁরা রেখে যেতে চান!

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

No comments:

Post a Comment