Aug 19, 2013

সরকারের ‘সাফল্যের’ প্রচারাভিযানের ফল কী?

বর্তমান সরকারের গত সাড়ে চার বছরের উন্নয়নের ফিরিস্তি প্রচার করে কয়েক দিন ধরে রাজধানী ঢাকার প্রায় দুই হাজার বিলবোর্ডে নানা প্রকারের চটকদার বিজ্ঞাপন শোভা পেতে দেখা গেল। শোনা যায়, এখন রাজধানী থেকে প্রচারণা ছড়িয়ে দেওয়া হবে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত। সরকারের সফলতা নিয়ে প্রচারাভিযান চলতেই পারে। উন্নয়ন নিয়ে এমন ইতিবাচক রাজনীতি করায় দোষের কিছু নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এ প্রচারাভিযান নিয়ে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছাড়াও বিভিন্ন মহল থেকে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অসদাচরণ ও অপরাজনীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে।
কিছু কিছু বিলবোর্ডে আওয়ামী লীগের আমলের সফলতার সঙ্গে বিএনপি আমলের ব্যর্থতার তুলনা করা হয়েছে। সরকারি কোষাগারের অর্থ দিয়ে দলীয় প্রচারণা চালানো একটি অনৈতিক কাজ।
এ ছাড়া নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেই এসব প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তাই এটি নির্বাচনী প্রচারণার অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালার ১২ ধারা অনুযায়ী, ‘কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা উহার মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি ভোট গ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিনের তিন সপ্তাহ সময়ের আগে কোনো প্রকার নির্বাচনী প্রচার শুরু করতে পারবেন না।’ তাই সরকারের ‘সাফল্যের’ এসব প্রচারণার মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কর্তৃক নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে।
এ ছাড়া আচরণ বিধিমালার ১১(গ) ধারায় বলা আছে, ‘নির্বাচন উপলক্ষে কোনো নাগরিকের জমি, ভবন বা অন্য কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির কোনোরূপ ক্ষতি সাধন করা যাইবে না...।’ উপরন্তু আচরণবিধির ৭(ক) ধারায় ‘সিটি করপোরেশন এবং পৌর এলাকায় অবস্থিত দালান, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি বা অন্য কোনো দণ্ডায়মান বস্তুতে’ প্রচারসামগ্রী লাগানোর ওপর বাধানিষেধ রয়েছে। সম্প্রতি তৈরি সিটি করপোরেশন নির্বাচনী আচরণবিধিতে বিলবোর্ডের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই আচরণবিধি লঙ্ঘন করে এসব প্রচারণা চালানোর ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ, এসব প্রচারণা আসন্ন নির্বাচনের জন্যও একটি অসমতল ক্ষেত্র তৈরি করছে।
কমিশনের পক্ষ থেকে হয়তো বলা হবে যে নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা করা হয়নি এবং নির্বাচন এখনো অনেক দূরে। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার অবকাশ নেই যে দশম সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার জন্যই এসব প্রচারণা চলছে। যেহেতু নিরপেক্ষ নির্বাচন করা কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব, তাই কমিশনের এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের সব তথ্য নাগরিকদের জানার অধিকার আছে। এ কারণেই দলকে প্রতিবছর তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। কিন্তু নাগরিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে গঠিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন তা অযৌক্তিকভাবে প্রকাশ করছে না। গত সাড়ে চার বছরে ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও জবরদখলের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ দল হিসেবেই দখলদারত্বে লিপ্ত হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী এই ঐতিহ্যবাহী দলটি এমন একটি খারাপ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবে, তা বিশ্বাস করাও দুরূহ!
আরও কয়েকটি বিষয় প্রাসঙ্গিক। সরকারের মেয়াদকালেই তারা বাজেট খাতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ কোটি টাকা ব্যয় করেছে ও করবে। গড়ে ১৫ কোটি জনগণের প্রত্যেকের জন্য বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে মাথাপিছু ব্যয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। পাঁচজনের পরিবারের জন্য পাঁচ বছরে সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। এ ছাড়া রয়েছে দাতাদের ব্যয়। রয়েছে বিরাট পরিমাণের বিদেশ থেকে আগত রেমিট্যান্স। তৈরি পোশাকশিল্প ও অন্যান্য খাতের রপ্তানি আয়। সরকারি-বেসরকারি খাতের এ বিপুল পরিমাণের আয় ও ব্যয়ের বিবেচনায় সরকারের ফিরিস্তি দেওয়া উন্নয়নের পরিমাণ অনেকের বিবেচনায় সামান্য।
সুনির্দিষ্টভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন আর দারিদ্র্য দূরীকরণের বিষয়ে আসা যাক। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০০০-২০১০ সালে বাংলাদেশে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ শতাংশ এবং দারিদ্র্য দূরীভূত হয়েছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে। বিশ্বব্যাংক দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ সফলতাকে অসাধারণ বলে আখ্যায়িত করেছে, যদিও দারিদ্র্যের পরিমাপ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অভূতপূর্ব সফলতা তিন সরকারের—চারদলীয় জোট সরকারের, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এবং বর্তমান সরকারের। তাই প্রবৃদ্ধি অর্জন আর দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে আমাদের সফলতা বর্তমান সরকারের একার নয়।
আর কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা সাধারণভাবে নগণ্য। কয়েক বছর আগে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে সারা পৃথিবীতে তিন হাজার ৯৯১ জন সফল ব্যক্তির মধ্যে পরিচালিত একটি সমীক্ষার ভিত্তিতে দীপা নারায়ণ ও তাঁর সহকর্মীরা দেখিয়েছেন, মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা সরকারি কার্যক্রমের মাধ্যমে দারিদ্র্যমুক্ত হতে পেরেছে। অনেকের মতে, বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে ‘দিনবদলের’ অঙ্গীকার করে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিনবদলের সনদে’ ২৩টি অগ্রাধিকার চিহ্নিত করা আছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ছিল পাঁচটি: দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান, দারিদ্র্য দূরীকরণ, বৈষম্যের অবসান এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মোটা দাগে এ পাঁচটি অঙ্গীকারে অন্তর্ভুক্ত ছিল: পেশিশক্তি, কালোটাকা, ঋণখেলাপি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলদারি, ঘুষ প্রভৃতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সম্পদের হিসাব প্রদান, তাঁদের জন্য একটি আচরণবিধি আইন প্রণয়ন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে দলীয়করণের অবসান, মেধা-যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রদান, সংসদকে কার্যকর করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, রাজনীতিতে শিষ্টাচার ও সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা তথা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন ইত্যাদি। চারদলীয় জোট সরকারের অপশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে জনগণ এসব পরিবর্তনের জন্যই মহাজোটকে মহাবিজয় উপহার দিয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তন কিছু ঘটেনি; বিশেষত ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য নিরসনে কোনো অগ্রগতিই ঘটেনি, বরং বৈষম্য আরও বেড়ে গেছে।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুত এসব পরিবর্তন সাধিত হলে দুর্নীতি হ্রাস পেত ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হতো এবং দিনবদলের পথ সুগম হতো। আর তাহলেই উন্নয়নের চাকা আরও দ্রুত গতিতে ঘুরত। কারণ, দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাবই জাতি হিসেবে আজ আমাদের পেছনে টেনে রাখছে। এ ছাড়া যেহেতু আমাদের প্রায় ১২ লাখ সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তা রয়েছেন এবং প্রতিবছর সরকারি খাতেই বিশাল পরিমাণের অর্থ ব্যয় হয়, তাই স্বাভাবিকভাবে যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, কিছু উন্নয়ন হবেই। এগুলো ধারাবাহিকতার উন্নয়ন।
কিন্তু দিনবদলের উন্নয়ন—যেমন দুর্নীতি দূরীকরণ, বিকেন্দ্রীকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, পদ্মা সেতু নির্মাণ ইত্যাদি আপনা থেকে হবে না। এগুলোর জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা, নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও অনমনীয়তা, যা প্রদর্শনে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। তাই বিলবোর্ডসহ সরকারের সাফল্যের এই প্রচারাভিযানে ‘দিনবদল’ শব্দটিই অনুপস্থিত।
পরিশেষে বলতে হয়, সাফল্যের প্রচারের থেকে বড় প্রশ্ন, সাফল্য থাকলে তা আপনাতেই দৃশ্যমান হয়, উন্নয়ন ঘটলে তা চেপে রাখা যায় না। আওয়ামী লীগ যে দিনবদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিল, সেই দিনবদলের কাজ কতটা হয়েছে, কতটা হয়নি তার বিচার জনগণ করতে পারে না—এমন অন্ধ এ দেশের জনগণ নয়। তাই, সরকারের তথাকথিত সাফল্য নিয়ে এই প্রচারাভিযানের তথা উন্নয়ন নিয়ে এ অপরাজনীতির কাজটি এক চরম অর্বাচীন সিদ্ধান্তের ফসল, যা অনেকটা আত্মঘাতী হয়েছে। এ রকম আত্মঘাতী প্রচারণার পুনরাবৃত্তি এড়াতে হলে যারা বিলবোর্ড কেলেঙ্কারির জন্য দায়ী, তাদের চিহ্নিত করা আবশ্যক।

তথ্যসূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ আগষ্ট, ২০১৩

No comments:

Post a Comment