Jul 25, 2013

এ যেন ছিল একটি গণভোট

গত ০৬ জুলাই অনুষ্ঠিত হলো বহু প্রতীক্ষিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। বিপুল উত্সাহ, উত্কণ্ঠা আর দুই প্রধান জোটের পারস্পরিক দোষা-রোপের মধ্য দিয়ে নির্বাচনটি সম্পন্ন হয়েছে। মূলত এ নির্বাচন ছিল দুটি দলের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। মহাজোট বিশেষত আওয়ামী সরকারের জোর প্রচেষ্টা ছিল বিজয়ের মধ্য দিয়ে সমপ্রতি অনুষ্ঠিত চারটি সিটি নির্বাচনে পরাজয়ের গ্লানি থেকে মুক্ত হওয়া, পক্ষান্তরে ১৮ দল তথা বিএনপি’র লক্ষ্য ছিল জয়ের ধারা অব্যাহত রাখা। কিছু বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত ঘটনা বাদ দিলে নির্বাচনটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলেই সকলের বিশ্বাস।

নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি দল একটি বড় অবদান রেখেছে। মহাজোট তথা আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় দুর্গ হিসেবে খ্যাত গাজীপুর হলেও দৃশ্যমানভাবে তারা নির্বাচনী ফলাফলকে তাদের পক্ষে নেয়ার কোনরূপ পদক্ষেপ নিয়েছে বলে মনে হয় না। এর একটি বড় কারণ একটি প্রায় সমশক্তিশালী ও আক্রমণাত্মক প্রতিপক্ষ।
নির্বাচনের আগ থেকেই বিরোধী দল নির্বাচন কমিশন ও সরকারি দলের বিরুদ্ধে একটি স্নায়ুযুদ্ধের অবতারণা করে। তারা বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করে কমিশন ও ক্ষমতাসীনদেরকে চাপের মুখে রাখে। এর থেকে সরকারি দলের মধ্যে এ ধারণা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক যে, ঢিল মারলে পাটকেল খেতে হবে।

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি অবদান ছিল গণমাধ্যমের ভূমিকা। দি ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৯৩৪ জন সংবাদকর্মী গাজীপুরে জনগণের চোখ ও কান হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়াও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ৯৪ জন আন্তর্জাতিক এবং ২৩১ জন স্থানীয় পর্যবেক্ষক নির্বাচনের দিনে গাজীপুরে উপস্থিত ছিলেন। প্রসঙ্গত, জাতীয় নির্বাচনে এ ধরনের নিবিড় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা সম্ভবপর নয়।

গত কয়েক বছরে আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে অনেকগুলো পরিবর্তন এসেছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অনেকেরই হয়তো মনে আছে আশির দশকের ভোটারবিহীন নির্বাচনের কথা। তখন থেকেই নির্বাচন পর্যবেক্ষণের প্রবর্তন এবং ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ এই শ্লোগানের আবির্ভাব হয়। এরপর ২০০৮ সালে নির্বাচনী বিধি-বিধানে অনেকগুলো পরিবর্তন আসে। একটি কঠোর আচরণবিধিও প্রণীত হয়, যার মাধ্যমে শোডাউন, যত্রতত্র মিটিং-মিছিল, যখন-তখন লাউড স্পিকার বাজানো ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়। যার ফলে নির্বাচনে উত্তাপ ও উস্কানি বহুলাংশে হরাস পায়। বিগত নির্বাচন কমিশন এসব বিধি-বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ করে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীরাও এগুলো মেনে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে নির্বাচনে খুন-খারাবির প্রায় অবসান ঘটে। নির্বাচনী সংস্কৃতির এমন ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতাই গাজীপুরের নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। প্রসঙ্গত, নির্বাচনী সংস্কৃতিতে আরও উত্কর্ষ সাধনের লক্ষ্যে ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর নতুন শ্লোগান: ‘আমার ভোট আমি দেব, জেনে-শুনে-বুঝে দেব’ এবং ‘টাকার খেলা বন্ধ না হলে নির্বাচন কলুষমুক্ত হবে না’।

গাজীপুরের নির্বাচনী ফলাফল—মহাজোটের নিজ ঘাঁটিতে মহাপরাজয়— অপ্রত্যাশিত কি না? অনেকেই তা মনে করেন না। অনেকের ধারণা যে, অতীতের পরাজয়ের ধারাবাহিকতাই গাজীপুরে অব্যাহত রয়েছে। ক্ষমতাসীন দল একের পর এক চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছে। এসব পরাজয় ক্ষমতাসীনদের জন্য জেগে উঠার ঘণ্টাধ্বনি বাজিয়েছিল। কিন্তু সরকার শুধু জনমতকে উপেক্ষাই করেনি, বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় এক ধরনের অহংবোধের পরিচয় দিয়েছে।

গাজীপুরের নির্বাচনী ফলাফলের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো যে, মহাজোট সমর্থিত প্রার্থী – সত্ ও যোগ্য বলে যার সুনাম রয়েছে—নিজের কেন্দ্রেও পরাজিত হয়েছেন। অর্থাত্ প্রার্থীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী এবং স্থানীয় ইস্যু এ নির্বাচনে কম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে জাতীয় ইস্যুসমূহ, বিশেষত মহাজোট সরকারের ‘দিনবদলের’ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ব্যর্থতা। স্মরণ করা যেতে পারে যে, দিনবদলের সনদের ২৩টি অগ্রাধিকারের মধ্যে পাঁচটি ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। আর এ পাঁচটির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল দুর্নীতি নির্মূল ও সুশাসন কায়েম করা। এ দু’টি অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে সরকার ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদের বিবরণ দেয়ার, দলীয়করণের অবসানের, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা’ গড়ে তোলার, ‘রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনোপার্জিত আয়, ঋণ খেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালো টাকা ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা’ গ্রহণের অঙ্গীকার করা হয়। এসব বাস্তবায়নের জন্য অর্থ-কড়ির পরিবর্তে প্রয়োজন ছিল সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা, যা গত সাড়ে চার বছরে ক্ষমতাসীনরা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সর্বোপরি, বর্তমান সরকার যেন জনগণের পরিবর্তে ‘আওয়ামী লীগে’র সরকারে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধাই যেন এখন দলীয় নেতা-কর্মীদের করায়ত্ব। তদবির আর টাকা ছাড়া এখন যেন কোনকিছুই ঘটে না। এ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ প্রতি পদে পদে বঞ্চিত হচ্ছে। কোথাও গিয়ে তারা যেন এখন কোনো অন্যায়ের প্রতিকার পায় না। গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলেও সাধারণ মানুষ প্রচলিত ব্যবস্থার শিকার ছিল। কিন্তু দিনবদলের আশা করেই এদেশের জনগণ মহাজোটকে মহাবিজয় উপহার দিয়েছিল, যা আজ অনেকের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। গাজীপুরের ‘জাতীয়’ নির্বাচনে ভোটাররা ক্ষমতাসীনদের সে অঙ্গীকার ভঙ্গেরই আরেকবার জবাব দিয়েছে।

গাজীপুরের নির্বাচনী ফলাফল থেকে আজ আমাদের দুই প্রধান দলকে সঠিক শিক্ষা নিতে হবে। ক্ষমতাসীনদেরকে শিক্ষা নিতে হবে যে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার তাদের অনমনীয়তা একটি কুতর্কে পরিণত হয়েছে। তারা যদি সত্যিকারার্থেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়, তাহলে নির্বাচনকালীন একটি নির্দলীয় সরকারের দাবিতে একমত হতে সমস্যা কোথায়? এ ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছা গেলে সবার অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে। এছাড়াও ভবিষ্যতে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের জন্যই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে।

পক্ষান্তরে, বিরোধী দল যেন মনে না করে যে, ক্ষমতাসীনদের প্রতি জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলে তারা বিরোধী দলকে ফুল দিয়ে বরণ করার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। জনগণ তাদের অতীতের সকল অপকর্মের কথা ভুলে গেছে। স্মরণ রাখতে হবে যে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় বর্তমান ক্ষমতাসীনদের অনেকটা পরিচ্ছন্ন ইমেজ ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রধান দু’টি দলের কারোরই সেই ইমেজ নেই। তাই পরবর্তী নির্বাচনের দিনে ভোটারদেরকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হবে এবং এ সিদ্ধান্ত যে বর্তমানে বিরোধী জোটের পক্ষে যাবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

আমরা মনে করি যে, গাজীপুরের নির্বাচনী ফলাফল দুটি দলের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানের আরেকটি সুযোগের সৃষ্টি করেছে। সৃষ্টি করেছে বৃহত্তর পরিসরে সংলাপ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছার এবং একটি ‘জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন ও স্বাক্ষরের। আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে আগামী নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করার পাশাপাশি অন্য সব আনুষঙ্গিক সমস্যা এ সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে হবে। আর তাহলেই আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের, ধর্মনিরপেক্ষতাকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর এবং দেশে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। এজন্য অবশ্য প্রয়োজন হবে দুই প্রধান দলের – আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরেও যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনাকে ধারণ করে, ব্যবসায়ী সমপ্রদায়, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে সংলাপ অনুষ্ঠানের। আর এই সংলাপে ঐকমত্য সৃষ্টির মধ্য দিয়েই স্বাক্ষরিত হতে পারে জাতীয় সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল।

সংলাপের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হতে হবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা এবং নির্বাচনী অঙ্গন থেকে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদেরকে দূরে রাখার বিষয়টি সম্পর্কিত ঐকমত্য সৃষ্টি। অন্তর্ভুক্ত হতে হবে নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকারের কিছু সুস্পষ্ট পদক্ষেপ। যেমন- সংসদকে কার্যকর করা, রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্রায়ন, বিচার বিভাগ ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে পরিচ্ছন্ন করা, ক্ষমতা ও সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ, রাজনৈতিক দলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা ইত্যাদি। আশা করি, রাজনীতিবিদগণ আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর পথের সমস্যাগুলোর স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন রাজনীতিকদের সামনে চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আশা করি নির্বাচনের ফলাফল পরাজিত ক্ষমতাসীনদের মধ্যে বোধোদয় ঘটাবে এবং বিজয়ী বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে উত্সাহিত করবে। এখনি উপযুক্ত সময় সম্ভাব্য সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়াতে সমঝোতার উদ্যোগ করা। আর সেক্ষেত্রে মূল ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে সরকারি দলকে। প্রধান বিরোধী দলকেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে, তাদেরকেও ফিরে আসতে হবে গঠনমূলক রাজনীতির ধারায়।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ৮ জুলাই, ২০১৩

No comments:

Post a Comment