Jun 4, 2013

দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব?



তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছাড়া সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব কি না—এ বিতর্ক আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আমাদের বিদায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদার সাম্প্রতিক বক্তব্য এ বিতর্কের মূল কারণ। ৪ ফেব্রুয়ারি কমিশনের বিদায় উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তবে কিছু শর্ত মানলে তা সম্ভব হতে পারে (প্রথম আলো, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২)।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এ টি এম শামসুল হুদার রয়েছে তিনটি শর্ত: (১) জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে চারটি মন্ত্রণালয় কমিশনের সঙ্গে পূর্বালোচনা ব্যতীত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারা; (২) এক মাস সময়ের মধ্যে সাত বিভাগে সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করা; এবং (৩) সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতি ব্যবহার করা। শর্তগুলো বিশ্লেষণ করা যাক।

প্রসঙ্গত, চারটি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত শামসুল হুদার বক্তব্য বিদায়ী নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সরকারের কাছে প্রেরিত সংস্কার প্রস্তাবেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিশন বিদ্যমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৪৪ই ধারা সংশোধনের লক্ষ্যে প্রস্তাব করে: ৪৪ই(৫) ‘সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পর থেকে এবং নতুন সংসদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত কমিশনের সঙ্গে পূর্বালোচনা ব্যতীত সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না, বিশেষত নিম্নলিখিত মন্ত্রণালয়সমূহ সম্পর্কিত বিষয়ে: (ক) মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, (খ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, (গ) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, (ঘ) স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়।’

মনে রাখা প্রয়োজন, বিদ্যমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৪৪ই ধারার (১) থেকে (৪) উপধারা অনুযায়ী, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর এবং নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার ১৫ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কোনো মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার, সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট জেলায় বা মেট্রোপলিটন এলাকায় কর্মরত তাঁদের অধস্তন কর্মকর্তাকে কমিশনের সঙ্গে পূর্বালোচনা ব্যতীত বদলি করা যাবে না। (কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবে ১৫ দিনের সময়সীমাকে ৩০ দিনে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে।) একই সঙ্গে কমিশন লিখিতভাবে অনুরোধ করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উপরিউক্ত কর্মকর্তাদের বদলি করবে। এ ছাড়া রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক তৈরি করা প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারের প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত কোনো ব্যক্তিকে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাঁর পূর্বানুমোদন ব্যতীত জেলার বাইরে বদলি করা যাবে না। উপরন্তু রিটার্নিং অফিসারের অনুরোধ মোতাবেক সংশ্লিষ্ট জেলায় বা মেট্রোপলিটন এলাকায় কর্মরত মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার, সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ বা তাঁদের অধস্তন কর্মকর্তাদের তাঁকে সহায়তা করতে হবে।

উপরিউক্ত বিধান অনুযায়ী নির্বাচনের সময়ে সারা দেশের মাঠ পর্যায়ের প্রায় সব সরকারি-বেসরকারি প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা কমিশনের কর্তৃত্বাধীন থাকে। বিদায়ী কমিশন এর বাইরে চারটি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কমিশনের সঙ্গে পূর্বালোচনার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টির দাবি করেছে। কিন্তু আমরা এ দাবির যৌক্তিকতা খুঁজে পাই না। কারণ, পূর্বালোচনার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা হলেও, মন্ত্রণালয়ের ওপর কমিশনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হবে না—বস্তুত পূর্বালোচনা অনেকটা পরামর্শ গ্রহণের পর্যায়ে পড়ে। আর কেউ পরামর্শ দিলে তা গ্রহণ করা না-করা নির্ভর করে মূলত পরামর্শগ্রহীতার ইচ্ছার ওপর। অর্থাৎ পরামর্শ গ্রহণের বিষয়টি ঐচ্ছিক (directory), বাধ্যতামূলক (mandatory) নয়।

তবে নির্বাচন কমিশন চারটি মন্ত্রণালয়ের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে সাংবিধানিক জটিলতাও সৃষ্টি হবে। আমাদের সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ নির্বাচন কমিশনকে চারটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব দিয়েছে: কমিশন ‘(ক) রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবেন; (খ) সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবেন; (গ) সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করিবেন; এবং (ঘ) রাষ্ট্রপতি পদের এবং সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুত করিবেন।’ আর সংবিধানের ৭(২) বলা হয়েছে যে সংবিধানের অধীনে ও কর্তৃত্বে যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সে দায়িত্বই পালন করবে।

এ ছাড়া মন্ত্রণালয়গুলো নির্বাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু নির্বাচন কমিশন নির্বাচনসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে গঠিত বিশেষায়িত (specialised) প্রতিষ্ঠান, নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব পালন করা এর দায়িত্ব নয়। উপরন্তু ক্ষমতা পৃথক্করণের নীতি (principles of separation of powers), যা বহু ব্যক্তির বহু শতাব্দীর অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার প্রতিফলন, আধুনিক রাষ্ট্রের খুঁটি সমতুল্য। আর এ নীতির ফলে, নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রম এ বিভাগের বাইরের প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পরিচালনা করা সঠিক নয়। তাই কমিশনের পক্ষে মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব গ্রহণ হবে সংবিধানের পরিপন্থী।

নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয় পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে একটি বাস্তব সমস্যাও জড়িত। একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০ লক্ষাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকেন এবং নির্বাচন কমিশনকে এঁদের কার্যক্রম তদারকি করতে হয়। এ বিরাট কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য কমিশনের সর্বশক্তি নিয়োগের প্রয়োজন পড়ে। ফলে নির্বাচন পরিচালনার পাশাপাশি কমিশনের পক্ষে চারটি মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব গ্রহণ করা সম্ভব নয় বলেই অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা।

একাধিক দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাকে ‘স্টেগার্ড’ পদ্ধতি বলা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সুপারিশ, এক মাসের মধ্যে সারা দেশে ৩০০টি আসনে নির্বাচন সম্পন্ন করা। এটি একটি ভালো সুপারিশ এবং আমরা এর পক্ষে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ পদ্ধতি বিরাজমান। যেমন, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও এটি চালু রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে তা করা সম্ভব কি না, সে ব্যাপারে অনেকেরই সন্দেহ রয়েছে।

আমাদের রাজনীতিতে একটি ভয়াবহ অবিশ্বাসের সংস্কৃতি বিরাজমান। যদিও সংসদীয় পদ্ধতিতে বিরোধী দলও সরকারের অংশ, তবু আমাদের প্রধান দুটি দল একে অপরকে বিশ্বাস করে না। কোটারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট রয়েছে এমন বিষয় ছাড়া আমাদের বড় দলের রাজনীতিবিদেরা কোনো বিষয়েই একমত হতে পারেন না। দেশের নাগরিকদের একটি বিরাট অংশও কোনো দল, এমনটি সরকারকে বিশ্বাস করে না। একাধিক দিনে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হলে সরকারের ওপর মানুষের বিশ্বাস থাকা অপরিহার্য।

একাধিক দিনে সংসদ নির্বাচন সফলভাবে করতে হলে নির্বাচনের দিনে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার ফলাফল ঘোষণা থেকে বিরত থাকতে হবে, যা করা না হলে প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী ফলাফল নির্বাচনের সার্বিক ফলাফলকে প্রভাবিত করবে। এ পদ্ধতিতে তাই সব এলাকার ব্যালট বা ইভিএম এক জায়গায় এনে তা নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা বা প্রশাসনের হেফাজতে রাখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে ইভিএম জেলা সদরে এনে তা জেলা প্রশাসকের স্ট্রংরুমে রাখা হয়। পরে সারা দেশে একই দিনে সব নির্বাচনী এলাকার ফলাফল গণনা এবং ঘোষণা করা হয়। পরাজিত দল বা জোটের নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যানের আমাদের দেশে বিরাজমান অপসংস্কৃতির কারণে এ ব্যবস্থা পরাজিতদের হাতে নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যানের জন্য আরেকটি নতুন অস্ত্র তুলে দেবে। এর ফলে আমাদের পুরো নির্বাচন পদ্ধতিই বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলতে পারে।

ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়ে আসা যাক। পশ্চিমা দুনিয়ার সঙ্গে আমাদের বিরাজমান ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ বা প্রযুক্তিগত ব্যবধান দূরীভূত করতে হলে সর্বক্ষেত্রে আমাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। আর ‘ইনফরমেশন হাইওয়ে’ বা তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়কে প্রবেশ করতে হলেও আমাদের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। তাই ভবিষ্যতে সব নির্বাচনেই আমাদের ইভিএম বা অন্য কোনো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।

এরই মধ্যে আমরা ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছি। পরপর তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এটি ব্যবহূত হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে নয়টি ওয়ার্ডে এটি ব্যবহূত হলেও, কুমিল্লায় সবগুলো ওয়ার্ডেই এটি ব্যবহূত হয়েছে।

এ তিনটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে আমাদের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক। একটি ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের জন্য যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা গেলেও, সে ত্রুটি অতি সহজেই সারানো গেছে এবং এতে ভোট গ্রহণে তেমন প্রভাব পড়েনি। এ ছাড়া যন্ত্রটি ব্যবহার করা অত্যন্ত সহজ, তাই স্বল্পশিক্ষিত, এমনকি নিরক্ষর ভোটারদেরও এটি ব্যবহারে তেমন অসুবিধা হয়নি। ফলে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে একটি জনমত সৃষ্টি হয়েছে। তবু আমরা মনে করি, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ ব্যাপারে একটি মতৈক্য সৃষ্টি হওয়া আবশ্যক। তা না হলে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে একটি অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টির সুযোগ হবে, যা এড়ানো বিশেষভাবে কাম্য।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে আমাদের বিরাজমান অবিশ্বাসের সংস্কৃতির কারণে মাসব্যাপী বা একাধিক দিনে একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভবপর নয়। ফলে এক দিনেই সারা দেশের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে, যা একটি বিরাট কর্মযজ্ঞ। এ কর্মযজ্ঞ পরিচালনার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ, অন্তত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব গ্রহণ সম্ভব হবে বলে আমাদের মনে হয় না। এ ছাড়া নির্বাচন-সম্পর্কিত কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে সৃষ্ট একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশনের পক্ষে নির্বাহী বিভাগের কাজে জড়িত হলে তা হবে সংবিধানের পরিপন্থী। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যবহারের মাধ্যমে ইভিএম পদ্ধতির পক্ষে একটি জনমত সৃষ্টি হলেও, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি মতৈক্য গড়ে না উঠলে অহেতুক বিতর্ক এড়াতে এটি জাতীয় নির্বাচনে ব্যবহার করা সঠিক হবে না। তাই আগামী সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে দলীয় সরকারের অধীনে তা অনুষ্ঠান না করাই যুক্তিযুক্ত হবে বলে আমরা মনে করি।

সূত্র: প্রথম আলো, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২

No comments:

Post a Comment