Jun 5, 2013

নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ

বাংলাদেশ সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনকে সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ অনুযায়ী প্রত্যেক আদমশুমারির পর নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ বাধ্যতামূলক। আইনের এ বিধান অনুসরণে কমিশন গত ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ, যথাযথভাবে সীমানা পুনর্নির্ধারণের ওপর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বহুলাংশে নির্ভর করে।

কমিশনের প্রকাশিত সীমানা পুনর্নির্ধারণের খসড়া তালিকাটি নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করা জরুরি। খসড়া তালিকাটি কি বিদ্যমান আইন অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে? এটি কি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ? এ ক্ষেত্রে কমিশন ‘জেরিম্যান্ডারিং’ বা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছে কি না?


অধ্যাদেশের ৬ ধারা অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ নির্ধারিত একক নির্বাচনী এলাকার সংখ্যার ভিত্তিতে সারা দেশকে বিভক্ত করতে হবে। এই বিভক্তির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সুবিধা (administrative convenience), আঞ্চলিক অখণ্ডতা (compact area) এবং সর্বশেষ আদমশুমারি থেকে পাওয়া জনসংখ্যার বিভাজনকে (distribution of population) যত দূর সম্ভব বিবেচনায় নিতে হবে। তা কি যথাযথভাবে করা হয়েছে?

কমিশন কর্তৃক জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ‘সীমানা পুনর্নির্ধারণে নিম্নোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে: ১. প্রতিটি জেলার ২০০৮ সালে নির্ধারিত মোট আসনসংখ্যা অপরিবর্তিত রাখা; ২. নির্বাচনী এলাকাগুলোর আগে নির্ধারিত সীমানা যত দূর সম্ভব বহাল রাখা; ৩. সংসদীয় আসন জেলাভিত্তিক বণ্টন এবং এক এক জেলায় অবস্থিত সংসদীয় আসনের এলাকা অন্য জেলায় সম্প্রসারণ না করা; ৪. যেখানে সম্ভব উপজেলা অবিভাজিত রাখা; ৫. যত দূর সম্ভব ইউনিয়ন, সিটি, পৌর ওয়ার্ড একাধিক সংসদীয় আসনের মধ্যে বিভাজন না করা এবং ৬. ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও যোগাযোগব্যবস্থা তথা জনগণের যাতায়াতের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় রাখা।’

দুর্ভাগ্যবশত উপরিউক্ত বিজ্ঞপ্তিতে বর্ণিত পদ্ধতি আইনে নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ নয়। বস্তুত, বর্তমান কমিশনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ আইনের উদ্দেশ্যের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনী এলাকাসমূহের পূর্বে নির্ধারিত সীমানা যত দূর সম্ভব বহাল রাখা’ হয়েছে। অর্থাৎ সর্বশেষ ২০০৮ সালে নির্ধারিত নির্বাচনী এলাকার সীমানা পারতপক্ষে পরিবর্তন করা হয়নি। কিন্তু সীমানা পুনর্নির্ধারণের উদ্দেশ্যই হলো জনসংখ্যার তথ্য বিবেচনায় নেওয়া, যাতে করে জনসংখ্যার দিক থেকে নির্বাচনী এলাকাগুলোয় যত দূর সম্ভব সমতা সৃষ্টি হয়। এ কারণেই প্রতি আদমশুমারির পর নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাই কমিশনের পূর্বে নির্ধারিত সীমানা যত দূর সম্ভব বহাল রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বস্তুত, এই নীতি অনুসরণের ফলে কমিশনের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক পদক্ষেপ লোক দেখানো উদ্যোগ বলেই মনে হতে পারে। ফলে কমিশনের বিরুদ্ধে এমনকি তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগও ওঠানো যেতে পারে।

এ কথা সত্য যে সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে কমিশনের দায়িত্ব হলো তিনটি মানদণ্ডের—প্রশাসনিক সুবিধা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং ভোটার সংখ্যার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। আর এ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে জনসংখ্যাই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। অর্থাৎ তিনটির মধ্যে জনসংখ্যার বিভাজনই ‘সুপেরিয়র’ বা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। কারণ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্য দুটি মানদণ্ডে সাধারণত তেমন পরিবর্তন ঘটে না। এ ছাড়া প্রশাসনিক সুবিধা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রাখতে গিয়ে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার ভোটার সংখ্যায় বিরাট পার্থক্য বিরাজ করলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যই ভন্ডুল হতে পারে। উপরন্তু ভোটার সংখ্যায় বিরাট অসমতা বিরাজ করলে সব নির্বাচনী এলাকার জন্য একই অঙ্কের নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণ করে দেওয়া চরমভাবে বৈষম্যমূলক।

সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণত সরকারি কর্মকর্তারা সহায়তা করে থকেন। কর্মকর্তারা মূলত প্রশাসনিক সুবিধা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর জোর দিয়ে থাকেন। তাই অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষত যেখানে সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য স্বাধীন কর্তৃপক্ষ থাকে, প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জন্য ভোটার সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০০২ সালের সীমানা নির্ধারণ-প্রক্রিয়ায় ভারতের স্বাধীন সীমানা নির্ধারণ কমিশন উত্তর প্রদেশের রাজ্যসভা নির্বাচনের জন্য প্রতিটি আসনের ভোটার সংখ্যা, ১০ শতাংশ বাড়ানো-কমানোর সুযোগ রেখে, তিন লাখ ২৭ হাজার ৬৯৬ জনে নির্ধারণ করে দেয় (ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি, ৪ মার্চ ২০০৬)।

প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, বর্তমান কমিশনের লোক দেখানো উদ্যোগের কারণে অতীতের ন্যায় নির্বাচনী এলাকাগুলোর মধ্যে ভোটার সংখ্যার বিরাট পার্থক্য দেখা দিয়েছে। যেমন: গত নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর সবচেয়ে বড় নির্বাচনী এলাকার (ঢাকা-১৯) ভোটার সংখ্যা ছিল ছয় লাখ দুই হাজার ৩৮৬ জন; একই সময়ে সবচেয়ে ছোট নির্বাচনী এলাকার (ঝালকাঠি-১ আসনে) ভোটার সংখ্যা ছিল এক লাখ ৩৭ হাজার ৯১ জন। অর্থাৎ এই দুই নির্বাচনী এলাকার ভোটার সংখ্যার পার্থক্য ছিল সাড়ে চার লাখের বেশি। সম্প্রতি প্রকাশিত খসড়া তালিকার তথ্যানুযায়ী ঢাকা-১৯-এ এবারও সর্বাধিক সংখ্যক আট লাখ দুই হাজার ১৬৪ জন ভোটার রয়েছেন। পক্ষান্তরে যশোর-৪-এর ভোটার সংখ্যা সর্বনিম্ন এক লাখ ৪৪ হাজার ৬৪। ফলে সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর ভোটার সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে সবচেয়ে ছোট নির্বাচনী এলাকার ভোটার সংখ্যার ব্যবধান সাড়ে ছয় লাখের অধিকে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ অসমতা আরও বেড়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
সাম্প্রতিক সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর এমনকি বিভিন্ন জেলার নির্বাচনী এলাকার মধ্যেও ভোটার সংখ্যার বিরাট তারতম্য রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, খসড়া তালিকায় ঢাকা-১৯-এর আট লক্ষাধিকের তুলনায় ঢাকা-১-এর ভোটার সংখ্যা মাত্র এক লাখ ৫২ হাজার ৫১৭ জন। একইভাবে গাজীপুর-১-এর ভোটার সংখ্যা ছয় লাখ ২১ হাজার ৭৮৬ জন হলেও গাজীপুর-৪-এর ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ২৯ হাজার ৮৮৩ জন। এসব বিরাট পার্থক্য আইনে বর্ণিত ভোটার সংখ্যার সমতা রক্ষার মানদণ্ডের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসংগতিপূর্ণ।

নির্বাচন কমিশন অবশ্য দাবি করতে পারে যে তারা নির্বাচনী এলাকার ভোটার সংখ্যায় ‘যত দূর সম্ভব’ সমতা রক্ষার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ অধ্যাদেশে ‘যত দূর সম্ভব’-এর কোনো সংজ্ঞা দেওয়া নেই। তবে এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হলো ৫ থেকে ৩০ শতাংশ ‘ভেরিয়েশন’ বা পার্থক্য। যেমন, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, আলবেনিয়া, ইয়েমেনে গ্রহণযোগ্য পার্থক্য ৫ শতাংশ; অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, ইউক্রেনে ১০ শতাংশ; আর্মেনিয়া, জার্মানি, চেক রিপাবলিকে ১৫ শতাংশ; জিম্বাবুয়ে, পাপুয়া নিউগিনিতে ২০ শতাংশ, কানাডাতে ২৫ শতাংশ; সিঙ্গাপুরে ৩০ শতাংশ (লিসা হেনডলি, ২০০৭)।

কমিশনের সাম্প্রতিক নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ উদ্যোগ আরেকভাবেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। সংসদীয় এলাকা পুনর্নির্ধারণের স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হলো: নিরপেক্ষতা (Impartiality), প্রতিনিধিত্ব (Representativeness), ভোটার সংখ্যার সমতা (Equality of voting strength), বৈষম্যহীনতা (Non-discrimination), এবং স্বচ্ছতা (Transparency)। তাই কমিশন ঘোষিত খসড়া তালিকায় এক নির্বাচনী এলাকা থেকে আরেক নির্বাচনী এলাকার ভোটার সংখ্যায় বিরাট পার্থক্য সমপ্রতিনিধিত্ব ও ভোটার সংখ্যার সমতার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

নির্বাচন কমিশন কি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতার সঙ্গে খসড়া সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজটি সম্পন্ন করেছে? অনেকেরই স্মরণ আছে যে গত ডিসেম্বর মাসে কমিশন যখন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এ বিষয়ে সংলাপ করে, তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে নির্ধারিত সীমানার ভিত্তিতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জোর দাবি উত্থাপন করে (দ্য ডেইলি স্টার, ৬ ডিসেম্বর ২০১২)। পক্ষান্তরে, বিকল্পধারার মতো দল আগের নির্ধারিত সীমানা সম্পূর্ণ বাতিল করার দাবি তোলে। কিন্তু কমিশন, নিজ স্বীকারোক্তি অনুযায়ীই, গতবারের নির্ধারিত সীমানা যত দূর সম্ভব বহাল রেখেছে। তাই কমিশন ক্ষমতাসীনদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেছে কি না, এই সিদ্ধান্ত পাঠকদের বিবেচনার জন্য রইল।

প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জারি করা বিজ্ঞপ্তি থেকে দেখা যায় যে ২০০৮ সালের নির্ধারিত সীমানার ৮৭টিতে কমিশন পরিবর্তন এনেছে। নিঃসন্দেহে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার ভোটার সংখ্যায় সমতা আনার জন্য তা করা হয়নি। তবে কি শুধু প্রশাসনিক সুবিধা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য তা করা হয়েছে? না কি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য কাজ করেছে? আশা করি কমিশন এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করবে। গণমাধ্যমও বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।

পরিশেষে, নির্বাচন কমিশন অগাধ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। উদাহরণস্বরূপ, সীমানা নির্ধারণ আইনে কমিশনকে নিজস্ব কার্যপদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী, কমিশনের সীমানা নির্ধারণ-সংক্রান্ত কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। এ ছাড়া কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার জন্য অন্য কোনো আপিল অথরিটিও নেই। তাই কোনোরূপ স্বেচ্ছাচারিতা কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট কাজ করলে কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো পদ্ধতি নেই। কোনো বিধান নেই কমিশনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার। তাই আইনটি সংশোধন করে সীমানা নির্ধারণের জন্য ভারতের ন্যায় একটি স্বাধীন সীমানা নির্ধারণ কমিশন গঠনের বিষয়টি আজ গভীরভাবে বিবেচনা করা আবশ্যক।

সূত্র: প্রথম আলো, ২১ মার্চ, ২০১৩

No comments:

Post a Comment