Jun 11, 2013

কারা প্রার্থী হলেন, কেন হলেন?

১৫ জুন বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট—এই চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এগুলোতে পূর্ববর্তী নির্বাচন হয়েছিল ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট। আইনানুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ১৮০ দিন আগে করপোরেশনের নির্বাচন হওয়ার কথা। তাই যথাসময়েই এ চারটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থায় এ দেশের মানুষের চরম বঞ্চনার অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত বাংলাদেশের সংবিধানে একটি স্বায়ত্তশাসিত ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলে এর ওপর ‘স্থানীয় শাসনের ভার’ অর্পণ করার বিধান রাখা হয়েছে।
এর বাস্তবায়নের জন্য অবশ্য প্রয়োজন নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে ক্ষমতা, দায়দায়িত্ব ও সম্পদ হস্তান্তরের লক্ষ্যে একটি বলিষ্ঠ বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচি, যা স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও হয়নি। একই সঙ্গে প্রয়োজন সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিদের এসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত হয়ে আসা। আসন্ন চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কী ধরনের ব্যক্তিরা প্রার্থী হয়েছেন, তার ওপরই নির্ভর করবে কারা নির্বাচিত হয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবেন।

প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রত্যেক প্রার্থীকে একটি হলফনামার মাধ্যমে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, অতীত ও বর্তমান মামলার খতিয়ান, আয়ের উৎস, নিজের এবং নির্ভরশীলদের আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব তাঁদের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে জমা দিতে হয়েছে তাঁদের আয়কর বিবরণী। এর উদ্দেশ্য হলো ভোটারদের তথ্য দিয়ে ক্ষমতায়িত করা, যাতে তাঁরা জেনে-শুনে-বুঝে নিজেদের বিবেচনায় সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।

এবারের বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মোট ১২ জন মেয়র, সাধারণ আসনে ৫৪৫ জন কাউন্সিলর, সংরক্ষিত আসনে ১৯৩ জনসহ মোট ৭৫০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত নির্বাচনে এই প্রার্থীর সংখ্যা ছিল মোট ৯৯৩ জন। ৪৬ জন মেয়র, ৭৫৩ জন সাধারণ আসনের কাউন্সিলর এবং ১৯৪ জন সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী। অর্থাৎ ২০০৮ সালের তুলনায় ২০১৩ সালের নির্বাচনের প্রার্থীর সংখ্যা ২৪৩ বা প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গিয়েছে। সর্বাধিক ৮৩ জন কমেছে সিলেটে। লক্ষণীয় যে ২০০৮ সালে যেখানে বরিশালে ১০ জন, খুলনায় ছয়জন, রাজশাহীতে ১৫ জন ও সিলেটে ১৫ জন—মোট ৪৬ জন মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, সেখানে প্রতিটি সিটি করপোরেশনে এবার মাত্র তিনজন মেয়র পদপ্রার্থী।

কেন এবার প্রার্থীর সংখ্যা কমে গিয়েছে? এর তাৎপর্যই বা কী? চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো এবার দলীয়ভাবে, বিশেষত মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে ‘মনোনয়ন’ দেওয়া হয়েছে। আরেকটি কারণ হলো নির্বাচন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে গিয়েছে। বস্তুত টাকার খেলা আজ সব নির্বাচনের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। অধিক হারে ব্যবসায়ীদের নির্বাচনী অঙ্গনে প্রবেশ করার ফলেই মূলত তা ঘটেছে।

নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া কোনোভাবেই ইতিবাচক নয়। কম প্রার্থী মানে কম যোগ্য প্রার্থী। ফলে ভোটারদের পছন্দ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধি কমে যায়। ভোটাররা সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তিকে নির্বাচিত করার সুযোগ হারান এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লক্ষণীয় যে অতীতে অনেক সমাজকর্মী, যাঁরা স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় কিন্তু কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নন, স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতেন; কিন্তু অতি দলীয়করণ ও টাকার প্রভাবের কারণে এসব প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে এগিয়ে আসেন না, নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে জোরদার করার জন্য যা অপরিহার্য।

চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। সংরক্ষিত আসনগুলো নারীদের জন্য সংরক্ষিত হলেও, সাধারণ আসনে নারী-পুরুষ উভয়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। চূড়ান্ত প্রার্থীদের তালিকা থেকে দেখা যায় যে মাত্র ১২ জন নারী সাধারণ আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন। এত স্বল্পসংখ্যক নারী সাধারণ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার তাৎপর্য হলো যে নারীরা এখনো নির্বাচনী অঙ্গনে নিজেদের পুরুষদের সমকক্ষ ভাবেন না এবং পুরুষদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। অর্থাৎ নারীর ক্ষমতায়নের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক দূর অগ্রসর হলেও, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে আমাদের আরও অনেক দূর যেতে হবে।

প্রার্থীদের শিক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে মেয়র প্রার্থীদের তিনজনের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি ও তার নিচে। সাধারণ আসনের কাউন্সিলরদের ৩১৩ জন বা ৫৭ দশমিক ৪৩ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা তার নিচে। সংরক্ষিত মহিলা আসনের ১৩৪ জন বা ৬৯ দশমিক ৪৩ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা তার নিচে। সব প্রার্থী মিলিয়ে ৪৫০ জনের বা ৬০ দশমিক শূন্য শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি ও তার নিচে এবং ৫৬৭ জন বা ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ এইচএসসি বা তার নিচে। তবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে কম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানে কম যোগ্যতা নয়।

প্রার্থীদের পেশার দিকে তাকালে দেখা যায় যে মেয়র পদপ্রার্থীদের ১২ জনের মধ্যে ১০ জন বা ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশই ও সাধারণ আসনের কাউন্সিলরদের ৩৮২ জন বা ৭০ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশই ব্যবসায়ী। অন্যদিকে সংরক্ষিত মহিলা আসনের প্রার্থীদের ১১০ জন বা ৬৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ গৃহিণী। সর্বসাকল্যে ৪১১ বা ৫৪ দশমিক ৮০ শতাংশই ব্যবসায়ী। অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনের মতো সিটি করপোরেশনের নির্বাচনও ব্যবসায়ীদের করায়ত্ত।
মেয়র পদপ্রার্থীদের নয়জন বা ৭৫ শতাংশের বিরুদ্ধে অতীতে মামলা ছিল এবং পাঁচজনের বিরুদ্ধে বর্তমানে ফৌজদারি মামলা আছে। সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের ১২০ জন বা ২২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশের বিরুদ্ধে অতীতে এবং ১৩৪ জন বা ২৪ দশমিক ৫৯ শতাংশের বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা রয়েছে।

হলফনামায় প্রার্থীদের নিজেদের এবং তাঁদের ওপর নির্ভরশীলদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব থেকে দেখা যায় যে প্রার্থীরাও, বিশেষত মেয়র পদপ্রার্থীরা অপেক্ষাকৃত বেশি সম্পদশালী। লক্ষণীয় যে চারজন বিদায়ী মেয়র ও নির্ভরশীলদের সম্পদ তাঁদের মেয়াদকালে হু হু করে বেড়ে গিয়েছে। যেমন বরিশালের বিদায়ী মেয়র ও তাঁর নির্ভরশীলদের সম্পদ বেড়েছে প্রায় ৫০ গুণ, খুলনার পাঁচ গুণ, রাজশাহীর ও সিলেটের দ্বিগুণ। যদিও আমরা বলছি না যে তাঁরা অবৈধভাবে এসবের মালিক হয়েছেন, তবু বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
সাধারণ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের ৩৯৩ জন বা ৭২ দশমিক ১১ শতাংশের সম্পদের পরিমাণ পাঁচ লাখ টাকার কম। কিন্তু এসব তথ্য কতটুকু সঠিক, তা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন রয়েছে, যা নির্বাচন কমিশনের খতিয়ে দেখা আবশ্যক। সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের অধিকাংশই যেহেতু গৃহিণী, তাঁদের সম্পদের পরিমাণও অপেক্ষাকৃত কম—১৫৯ জন বা ৮৭ দশমিক ৫৬ শতাংশের সম্পদের পরিমাণ পাঁচ লাখ টাকার কম। তবে কম বিত্তশালীদের মধ্যে কতজন নির্বাচিত হন, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ও তাঁদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের আয়ের উৎস ও পরিমাণের এবং দায়দেনা ও ঋণের তথ্যও হলফনামায় প্রদান করতে হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায় যে কাউন্সিলরদের আয়ের তথ্যে বহুমুখিতা থাকলেও, চারজন বিদায়ী মেয়রের ও নির্ভরশীলদের আয় তাঁদের মেয়াদকালে ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছে। এর কারণও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ, রাজনীতি আজ ‘লাভজনক ব্যবসায়ে’ পরিণত হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন আজ অনেক নাগরিকের মনেই দেখা দিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা যায় যে খুব কম প্রার্থীরই উল্লেখযোগ্য দায়দেনা রয়েছে।

প্রার্থীদের প্রদত্ত আয়করের বিবরণী থেকে দেখা যায় যে মেয়র পদপ্রার্থী ১১ জন আয়কর বিবরণী জমা দিয়েছেন এবং আটজনের আয়কর প্রদানের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের মধ্যে অধিকাংশ ব্যবসায়ী হলেও, তাঁদের মধ্যে আয়করদাতার সংখ্যাও অতি নগণ্য—৫৪২ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ২২২ জন বা ৪০ দশমিক ৯৫ শতাংশ আয়কর দেন। অর্থাৎ আয়কর প্রদানকারীর সংখ্যা বাড়াতে হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের দিকে নজর দিতে হবে।

পরিশেষে, নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু নির্বাচনে অসৎ, অযোগ্য ও স্বার্থপর ব্যক্তিরা নির্বাচিত হলে গণতন্ত্র কার্যকর ও জনকল্যাণমুখী হওয়ার পরিবর্তে তার বিপরীতই ঘটে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও ভালো চলে না। আসন্ন চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের সুযোগ এসেছে প্রার্থীদের হলফনামা ও আয়কর বিবরণীতে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জেনে-শুনে-বুঝে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগের। আশা করি, ভোটাররা সুবিবেচনার পরিচয় দেবেন এবং ভাবাবেগের পরিবর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন।

সূত্র: প্রথম আলো, ৬ জুন ২০১৩

No comments:

Post a Comment