May 8, 2013

সুশাসন: নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি জরুরি

নির্বাচন প্রক্রিয়া কলুষমুক্ত করতে হলে নির্বাচনী ব্যয় হ্রাস জরুরি। আর নির্বাচন কলুষমুক্ত না হলে গণতন্ত্র শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াবে না এবং আমাদের অবস্থা হয়ে যাবে ‘টাকা দিয়ে কেনা সেরা গণতন্ত্র’। গত আগস্টে অনুষ্ঠিত চারটি সিটি করপোরেশন ও নয়টি পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলেও, অনেক নির্বাচনী এলাকায় বড় ধরনের টাকার খেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নির্বাচনকে কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই আমাদের আকাঙ্ক্ষা, আসন্ন জাতীয় সংসদ ও উপজেলা নির্বাচন যেন টাকার প্রভাবমুক্ত হয়।

‘গণপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধিত) আদেশ, ১৯৭২’-এর ৪৪বি(৩এ) উপধারা অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয়সীমা ভোটার সংখ্যানুযায়ী পাঁচ থেকে ১৫ লাখ টাকা। তবে নির্ধারিত এ ব্যয় নিম্নবর্ণিত কাজে ব্যবহার করা যাবে না: ক. একাধিক রঙের পোস্টার ছাপানোর জন্য;
খ. নির্ধারিত বা কমিশন কর্তৃক নির্দিষ্ট মাপের চেয়ে বড় পোস্টার ছাপানোর জন্য; গ. গেট, তোরণ বা ঘেরা তৈরির জন্য; ঘ. ৪০০ বর্গফুটের অধিক আয়তনের প্যান্ডেল স্থাপনের জন্য; ঙ. একটি নির্বাচনী এলাকায় জনসভা অনুষ্ঠানের ক্ষেত্র ব্যতিরেকে একই সঙ্গে তিনটির অধিক মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহার করার জন্য; চ. ভোটের জন্য নির্ধারিত তারিখের তিন সপ্তাহ আগে যেকোনো সময় কোনো প্রকারের নির্বাচনী প্রচার শুরু করার জন্য; ছ. কোনো ইউনিয়নে বা কোনো পৌর এলাকা বা সিটির কোনো ওয়ার্ডে একাধিক নির্বাচনী ক্যাম্প বা অফিস বা কোনো নির্বাচনী এলাকায় একাধিক কেন্দ্রীয় ক্যাম্প বা অফিস স্থাপনের জন্য; জ. ভোটারদের যেকোনো প্রকারের আপ্যায়নের জন্য; ঝ. কোনো মিছিল বের করার লক্ষ্যে কোনো গাড়ি বা নৌকা, যেমন ট্রাক, বাস, কার, ট্যাক্সি, মোটরসাইকেল ও স্পিড বোট, নৌযান ব্যবহারের জন্য; ঞ. কোনো ভোটকেন্দ্রে বা ভোটকেন্দ্র থেকে ভোটারদের আনা-নেওয়ার জন্য যেকোনো প্রকারের যানবাহন বা জলযান ভাড়া করা বা ব্যবহারের জন্য; ট. বিদ্যুৎ ব্যবহার করে যেকোনো প্রকার আলোকসজ্জার জন্য; ঠ. প্রার্থীর সাদা-কালো ব্যতীত অন্য কোনো রঙের প্রতীক বা প্রতিকৃতি ব্যবহার কিংবা প্রদর্শনের জন্য; ড. কোনো কালি বা রং দ্বারা বা অন্য কোনোভাবে দেয়াল ছাড়াও কোনো দালান, থাম, বাড়ি বা ঘরের ছাদ, সেতু, যানবাহন বা অন্য কোনো প্রচারণামূলক কোনো লিখন বা অঙ্কন করার জন্য; ঢ. ভোট গ্রহণের দিন ক্যাম্প পরিচালনার জন্য। এ ছাড়া নির্বাচনী ব্যয় চাঁদা-অনুদান হিসেবেও প্রদান করা যাবে না।

উপরিউক্ত বিধান থেকে এটি সুস্পষ্ট, নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত তারিখের আগে কোনো নির্বাচনী ব্যয় সম্পন্ন করা যাবে না। ‘সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮’-এর ১২ ধারা অনুযায়ী, এমনকি ‘কোন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা উহার মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাহাদের পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি ভোট গ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিনের তিন সপ্তাহের পূর্বে কোন প্রকার নির্বাচনী প্রচার শুরু করিতে পারিবেন না।’ অর্থাৎ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ২৮ নভেম্বরের আগে কোনো প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতে পারবেন না এবং এ জন্য ব্যয়ও করতে পারবেন না। যদি করেন, তবে তা ‘গণপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধিত) আদেশ, ১৯৭২’-এর ৪৪বি(৩বি) উপধারায় নির্ধারিত পরিমাণের অধিক নির্বাচনী ব্যয় বলে গণ্য হবে, যা হবে ৪৪বি ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন [৪৪বি(৩বি)]। আরও সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে, নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনার লক্ষ্যে নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখের আগে সাধিত সব ব্যয় বেআইনি। নির্বাচন কমিশনের মতে, সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর থেকে নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখের তিন সপ্তাহ আগের নির্বাচনী প্রচারণার সব ব্যয়ই আইনবহির্ভূত।

আইনবহির্ভূত এ ব্যয়ের তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ‘গণপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধিত) আদেশ, ১৯৭২’-এর ৭৩(২এ) উপধারা অনুযায়ী একটি নির্বাচনী অপরাধ। এ অপরাধকে ‘দুর্নীতিমূলক কার্যক্রম’ বলে আখ্যায়িত করা হয় এবং এর শাস্তি অন্যূন দুই ও অনধিক সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং একই সঙ্গে অর্থদণ্ড। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ ধরনের অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরবর্তীকালে নির্বাচনে অংশ নিতে অযোগ্য হয়ে পড়বেন।

গত রমজানের ঈদ ও দুর্গাপূজার সময় আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক অনেক প্রার্থীকে রঙিন পোস্টার ছাপিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা গেছে। নির্বাচন কমিশন এগুলোকে নির্বাচনী প্রচারণামূলক ব্যয় বলে আখ্যায়িত করে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে এগুলো তুলে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। এ ছাড়া অনেকে ইফতার, ঈদ পার্টি, বড় ধরনের আপ্যায়নের অনুষ্ঠান, অনুদান বিতরণ ইত্যাদির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। নির্বাচন-পরবর্তীকালে পরাজিত প্রার্থীদের পক্ষে এসব ব্যয়কারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতিমূলক কার্যক্রমের অভিযোগ উত্থাপিত হলে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল কী সিদ্ধান্ত প্রদান করে তা দেখার বিষয়। এ ছাড়া অষ্টম সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর নির্বাচনী শোডাউনসহ অন্যান্য খাতে নির্বাচনী প্রচারণামূলক ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ট্রাইব্যুনাল সম্ভাব্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী রায় দেয় তাও ভবিষ্যতে লক্ষণীয়।

নির্বাচনী ব্যয় হ্রাসের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে নির্বাচনী শোডাউন, দেয়াল লিখন, তোরণ নির্মাণ ইত্যাদি বন্ধের বিধান করেছে। এ লক্ষ্যে আরও কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যেমন, প্রার্থীদের হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে রিটার্নিং অফিসারদের উদ্যোগে কমন পোস্টার ছাপা এবং এগুলো প্রার্থীদের মধ্যে সমভাবে বিতরণ করা যেতে পারে। প্রার্থীদের কাছ থেকে পোস্টার ছাপানোর খরচ নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া রিটার্নিং অফিসাররা প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় সব প্রার্থীর উপস্থিতিতে প্রজেকশন মিটিংয়ের আয়োজন করতে পারেন। উল্লেখ্য, গত সরকারের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত ফরিদপুর-১, দিনাজপুর-১ ও গাইবান্ধা-৪ আসনের উপনির্বাচনে ‘সুজন−সুশাসনের জন্য নাগরিকে’র উদ্যোগে প্রার্থী ও ভোটারদের মুখোমুখি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া গত আগস্টে অনুষ্ঠিত চারটি সিটি করপোরেশন ও নয়টি পৌরসভা নির্বাচনেও সুজনের পক্ষ থেকে একই ধরনের অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়। উল্লেখ্য, এসব অনুষ্ঠান ভোটারদের মধ্যে ‘পলিটিক্যাল এজুকেশন’ বা রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং সব মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে।

সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয়ের উৎসের একটি বিবরণী দাখিল করা বাধ্যতামূলক। নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব তফসিলী ব্যাংকে সংরক্ষণ করাও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নির্ধারিত ফরমে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করবেন এবং এ হিসাবের সঙ্গে প্রার্থীর নিজের ও তাঁর নির্বাচনী এজেন্টের পক্ষ থেকে হলফনামা সংযুক্ত করতে হবে। নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব প্রদান না করা সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ৭৪ ধারা অনুযায়ী ‘বেআইনি কার্যক্রম’, যার শাস্তি দুই থেকে সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং একই সঙ্গে অর্থদণ্ড।

নির্বাচনের জন্য প্রার্থী মনোনয়ন দানকারী রাজনৈতিক দলের জন্যও নির্বাচনসংক্রান্ত আয় ও ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা: ক. মনোনীত প্রার্থীর সংখ্যা দুই শতাধিক হলে চার কোটি ৫০ লাখ টাকা; খ. মনোনীত প্রার্থীর সংখ্যা এক শতাধিক কিনতু দুই শতাধিক না হলে তিন কোটি টাকা; গ. মনোনীত প্রার্থীর সংখ্যা এক শতাধিক না হলে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা; ঘ. মনোনীত প্রার্থীর সংখ্য ৫০-এর বেশি না হলে ৭৫ লাখ টাকা। রাজনৈতিক দলকে দান হিসেবে পাঁচ হাজার টাকার অধিক অর্থ প্রাপ্তির উৎস, নাম-ঠিকানা পরিষ্কার দেখাতে হবে। এ ছাড়া রাজনৈতিক দল ২০ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে কোনো দান চেক ব্যতীত গ্রহণ করতে পারবে না। এ বিধানাবলি লঙ্ঘনের জন্য রাজনৈতিক দল অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলের পক্ষেও নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনী ব্যয়ের বিবরণী কমিশনে দাখিল করতে হবে। নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব দাখিল করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার সর্বশেষ শাস্তি দলের নিবন্ধন বাতিল।

দুর্ভাগ্যবশত নির্বাচনী হিসাব দাখিলের ক্ষেত্রে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের অতীত ভূমিকা অত্যন্ত অসন্তোষজনক। যেমন, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী এক হাজার ৯৩৮ জন প্রার্থীর মধ্যে এক হাজার ৪২৯ জন নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব দাখিল করেন, অর্থাৎ ৫০৯ জন প্রার্থী তাঁদের হিসাব দাখিল করেননি। এ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দলই নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব দাখিল করেনি। কিনতু আইন অমান্য করার কারণে কারোরই কোনো শাস্তি হয়নি। আশা করি, বর্তমান নির্বাচন কমিশন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রদর্শন করবে।

নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত এগুলোর পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণ আবশ্যক। এ জন্য অডিটর নিয়োগ করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে অন্ধ্র প্রদেশ, কর্নাটক ও সিকিমের প্রাদেশিক নির্বাচনকালে প্রার্থীদের দৈনন্দিন নির্বাচনী ব্যয় তদারকির লক্ষ্যে টি এন সেশনের নেতৃত্বে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন এমনইভাবে অডিটর নিয়োগ করেছিল। প্রসঙ্গত, প্রার্থীদের হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে প্রদত্ত তথ্য যাচাইয়ের জন্য প্রতি নির্বাচনী এলাকায় দুজন নির্বাচন মনিটরিং অফিসার নিয়োগ করা হবে বলে আমাদের নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি যে ঘোষণা দিয়েছে, তাঁরাই নির্বাচনের সময় অডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো, ৭ নভেম্বর ২০০৮

No comments:

Post a Comment