May 21, 2013

শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনই যথেষ্ট নয়



অনেকেই এখন দাবি করছেন যে, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শানি-পূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনই যথেষ্ট। এর জন্য সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তুর্ভূক্ত রাখার প্রয়োজন নেই। তবে এ দাবি নতুন নয়। কিন’ এ দাবি কি যৌক্তিক, বিশেষত আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে? আমাদের গত সাড়ে চার বছরের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা থেকে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া সম্ভব।


সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন অনেকগুলো দায়িত্ব পালন করে, যা না করলে ‌একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশা হবে সুদূরপরাহত।
আমাদের সংবিধান (অনুচ্ছেদ ১১৯) কমিশনের ওপর চারটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব অর্পন করেছে: রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠান, সংসদসদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান, সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, এবং রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রণয়ন।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আমাদের বর্তমান নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রস’ত করে, যা সর্বমহলে সমাদৃত হয়েছে। কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের ভিত্তিতে ৩০০টি সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে, একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করে। এ কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য কমিশন অনেকগুলো আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন হয় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর (আরপিও) আমূল সংস্কার। রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে কমিশন এতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সুপারিশ করে, যা নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করেন। প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মাপকাঠিতে আরও কঠোরতা আনয়ন, প্রার্থীদের তথ্য প্রদানে বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি, নির্বাচনে সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা নির্ধারণ, কতগুলো শর্তসাপেক্ষে রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ইত্যাদি ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের অংশ।

রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো হলো: দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা, দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিলুপ্তি, দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের তৈরি প্যানেলের ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রদান, দলের বিদেশি শাখার অবসান ইত্যাদি। রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে এসব বিধান আরপিও-তে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এসব উপেক্ষা করে, তাই এর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি।

উদাহরণস্বরূপ, দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মতামত না নিয়েই বিএনপি সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন চূড়ান্ত করে। আওয়ামী লীগ তাদের নেতা-কর্মীদের সুপারিশ নিলেও তা বহুক্ষেত্রে উপেক্ষা করে। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের কিছুই করার ছিল না, কারণ বিষয়টি নিয়ে উচ্চবাচ্য করলে নির্বাচনই অনিশ্চিত হয়ে যেত। কারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কমিশন তখন অনেকটা জিম্মি দশায় ছিলো। উল্লেখ্য, পরবর্তী সময়ে নবম জাতীয় সংসদ কর্তৃক আরপিও অনুমোদনের সময় দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মতামত গ্রহণের বাধ্যবাধকতার বিষয়টিকেই দুর্বল করে ফেলে। এখন শুধু তাদের তৈরি প্যানেল বিবেচনায় নিয়েই দল মনোনয়ন দিতে পারবে। দুর্ভাগ্যবশত দলের নেতা-কর্মীরা এ ব্যাপারে টু-শব্দটিও করেনি।

দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চার বিষয়টিও তাঁরা উপেক্ষা করেন; কিন্তু দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতন্ত্রের চর্চা আশা করা দুরাশা মাত্র। দলের বিদেশি শাখাও বিলুপ্ত করা হয়নি। প্রধান দু’টি দলের বিদেশি শাখা সমপ্রতি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেত্রীকে বিদেশের মাটিতে কালো পতাকা দেখিয়ে দেশের মর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুন্ন করেছে।

অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন বিলুপ্ত না করায় আপত্তি তোলা হলে দলগুলোর পক্ষ থেকে কমিশনকে চোখরাঙানি খেতে হয়। উচ্চকন্ঠে অভিযোগ তোলা হয় যে, কমিশন রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে, যদিও কমিশন নিতান্তই জাতীয় সংসদে পাশ করা আইন মান্য করার ব্যাপারে দলগুলোকে তাগিদ দিচ্ছিল। দলগুলো অবশ্য তাদের গঠনতন্ত্র থেকে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নাম বাদ দিয়ে আক্ষরিক অর্থে মূল উদ্দেশ্য উপেক্ষা করে আইন মানার চেষ্টা করে। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে আইন অমান্য করার আরেকটি নগ্ন দৃষ্টান্ত হলো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দলীয় মনোনয়ন প্রদান, যার কারণে এসব নির্বাচনে গড় প্রার্থীর সংখ্যা কমে গেছে এবং ভোটাররা সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে নির্বাচন কমিশন যত শক্তিশালীই হোক এবং আইনে যত কঠোর বিধানই থাকুক না কেন, রাজনৈতিক দলগুলো আইন না মানলে কমিশনের তেমন কিছুই করার থাকে না। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতার পরিবর্তন না হলে সবচেয়ে স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না।

আরপিওতে প্রার্থীদের নিজেদের এবং নিজ পরিবার সম্পর্কে তথ্য প্রদানের বিধান করা হয়। কিন্ত এটি সবারই জানা যে তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে প্রার্থীরা হলফনামা দাখিল করে ব্যাপক কারচুপির আশ্রয় নিয়েছেন। এমনকি কিছু ব্যক্তি শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে মশকরাও করেছেন। এক্ষেত্রেও কমিশনকে অনেকটা ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকাই পালন করতে হয়েছে।

নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রে সব নির্বাচনেই এক ধরনের অরাজকতা বিরাজ করেছে। আমাদের প্রধান দলগুলো মনোনয়ন-বাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছে। সংসদ নির্বাচনে ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা ১৫ লাখ টাকা হলেও, প্রায় অধিকাংশ প্রার্থীই এর অনেকগুণ বেশি ব্যয় করেছেন। নির্বাচনে অনেকে কোটি কোটি টাকা ‘বিনিয়োগ’ করেছেন বলে শোনা যায়, কিন্তু নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব দাখিলের সময় তাঁরা মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোও কমিশনের কাছে নির্বাচনী ব্যয়ের মিথ্যা তথ্য জমা দিয়েছে। বস’ত, নির্বাচনে টাকার খেলা নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচনী ব্যয়ের ব্যাপারে আইনি বাধ্যবাধকতার প্রতি ভ্রুক্ষেপও করেননি, অনেকটা যথেচ্ছাচারে লিপ্ত হয়েছেন।

অতীত ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল শাসন প্রক্রিয়ায় সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের তথা বিত্তের প্রভাব দূর করা। বাজারের পরিবর্তে ব্যালট বাক্সের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনায় সাধারণ মানুষের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত টাকার প্রভাবের কারণে আজ আমাদের রাষ্ট্র বিত্তশালীদের করায়ত্ত হয়ে গেছে। আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার থাকলেও, সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই। বস্তুত, আমাদের গণতন্ত্র হয়েছে ‘বেষ্ট ডেমোক্রেসি মানি ক্যান বাই’-টাকা দিয়ে যে ধরনের গণতন্ত্র কেনা যায় সেগুলোর মধ্যে সেরা। আমাদের রাজনীতিবিদদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন না এলে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানো অসম্ভব।

নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলেও, এর পরে বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পরবর্তী নির্বাচনগুলো অনেক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এসব নির্বাচনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও অনেক অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে স্বয়ং নির্বাচন কমিশনই তাদের অসষ্টি প্রকাশ করেছে। উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে যেসব এলাকায় নির্বাচন স’গিত হয়েছে, সেগুলো তদন্তের জন্য পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক ও বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব তদন্ত কমিটির রিপোর্টের নিরপেক্ষতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

গত সাড়ে চার বছরের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করে না, যদিও এ ক্ষেত্রে কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কমিশন একটি পক্ষ মাত্র। অন্য পক্ষগুলো হলো: প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দল, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী ইত্যাদি। এমনকি বিচারবিভাগেরও এ ব্যাপারে ভূমিকা রয়েছে। কারণ গত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি যে বিভিন্ন নির্বাচনে রিটানিং কর্মকর্তা এবং আপিল গ্রহণকারী পক্ষ হিসেবে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রার্থিতা বাতিলের পরও, আদালতে গিয়ে অনেক বিতর্কিত প্রার্থী তাঁদের প্রার্থিতা বহাল করতে সক্ষম হয়েছেন, এমনকি নির্বাচনের আগের দিনেও।

প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ না হয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পক্ষপাতিত্ব করে, তাহলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে কোনোভাবেই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভবপর নয়। আমাদের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিটি ক্ষমতাসীন দলের অধীনেই নগ্নভাবে দলীয়করণের শিকার, যা নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে একটি পর্বতপ্রমাণ বাধা হয়ে পড়েছিল। কারণ পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার জন্য তাঁদের রাজনৈতিক প্রভুদের কাছ থেকে একটি ইশারাই যথেষ্ট। অনেক সময় অতি উৎসাহের বশবতী হয়ে কর্মকর্তারা নিজেরাই তা করেন। প্রসঙ্গত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক দলীয়করণের কারণেই ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে মহাজোট অংশ নেয়নি।

রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রার্থীরা যদি আইন অমান্য করতে এবং বৈধ-অবৈধ সকল উপায় অবলম্বন করে নির্বাচনে জিততে বদ্ধপরিকর হয়, তা হলেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান অসম্ভব। এ ছাড়াও সূষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অর্থবহ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন কতগুলো পদ্ধতিগত সংস্কার এবং দল ও প্রার্থীদের আইন মানার এবং কমিশনের আধিপত্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা প্রদর্শনের এক নতুন সংস্কৃতি। আরও প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সবার অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

সূত্র: প্রথম আলো ১২ জুন ২০১১

No comments:

Post a Comment