May 8, 2013

উভয় সংকটে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা

সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী সম্প্রতি ‘সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা রক্ষা কমিটি’ নামে একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করেছে। বেশ কয়েকজন সম্পাদক ও সাংবাদিক প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত কমিটির উদ্দেশ্য হলো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বার্থ রক্ষা করা। নিঃসন্দেহে এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

প্রশাসন, সংসদ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমকেও আধুনিক রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই সরকারের অন্য তিনটি শাখার মতো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ অবশ্য দায়বদ্ধতা। কারণ দায়বদ্ধতাহীন স্বাধীনতা সাধারণত রূপান্তরিত হয় লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতায়, যার অপর নাম যথেচ্ছাচার। অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে এর জবাবদিহিও অতি আবশ্যক।


সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অনেক কারণের মধ্যে একটি হলো, এর মাধ্যমে সংবাদকর্মী ও সংশ্লিষ্ট সবার বাক্ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা কার্যকর হয়, যা তাদের একটি সংবিধান স্বীকৃত অধিকার। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘(১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ তাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আরেকটি বড় যুক্তি হলো, এর মাধ্যমে জনস্বার্থ রক্ষা ও সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়ার পথ সুগম হয়। সরকারের হাতে বৈধভাবে বল প্রয়োগের ক্ষমতা (coercive power) রয়েছে। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন সরকারকে সে ক্ষমতা দিয়ে থাকে। যেমন, সরকার যেকোনো ব্যক্তিকে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করতে পারে; যদিও সরকারের বল প্রয়োগের ক্ষমতা আইনানুগ ও যুক্তিসংগতভাবে প্রয়োগ করার কথা, তবু এ ব্যাপারে অবাধ (discretionary) ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে বাড়াবাড়ি করার অবকাশ থেকে যায়। উদাহরণস্বরূপ, পুলিশের সাম্প্রতিক বিশেষ অভিযানের সময় ‘গ্রেপ্তার বাণিজ্য’র অভিযোগ উঠেছে, যেমন উঠেছিল অতীতের সরকারগুলোর সময়ও। সংবাদমাধ্যম এসব বাড়াবাড়ির এবং আইনের অপপ্রয়োগের ঘটনা প্রকাশ করে ‘শাসকে’র কাছ থেকে ‘শাসিত’কে রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দুই শতাধিক বছর আগে রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকের অধিকার হননের বিরুদ্ধে জেমস মেডিসন সাবধানবাণী উচ্চারণ করে গিয়েছিলেন।

আমাদের সমাজে ব্যাপক দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের সমস্যার বড় কারণ হলো সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব। বিখ্যাত মার্কিন বিচারপতি লুই ব্রান্ডাইসের মতে, ‘সানলাইট ইজ দ্য বেস্ট ডিসইনফেকট্যান্ট’ বা রোদের আলোই সর্বাধিক কার্যকর প্রতিষেধক। অর্থাৎ স্বচ্ছতাই সততা নিশ্চিত করার সর্বাধিক কার্যকর পন্থা। এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। আর ‘তথ্য অধিকার আইন’ কার্যকর হলে এ ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় অপরিহার্য হলেও তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতা বিরাজমান। সরকারই এ ব্যাপারে বড় প্রতিবন্ধক। কারণ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষমতাসীনদের অপকর্ম করার ‘স্বাধীনতা’কে খর্ব করে; তাদের অপশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিপত্তি ঘটায়। ‘সংগত’ কারণেই সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করার উদ্যোগ নেয়। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে; যে গর্হিত কাজটি অনেক দিন ধরেই চলে আসছে। অতীতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বা হাওয়া ভবনেও সম্পাদক ও মালিকদের ডাক পড়ত। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের অবসান হওয়া জরুরি। আশা করি, বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পথে আরেকটি বড় বাধা হলো সংবাদমাধ্যমের মালিক ও সাংবাদিকদের দলীয় লেজুড়বৃত্তি। এটি সংশ্লিষ্ট লোকদের নিজেদের সৃষ্ট বাধা। দলবিশেষের প্রতি আনুগত্যের কারণে বাংলাদেশের অন্য পেশাজীবীদের মতো সাংবাদিকেরাও বিভক্ত। তাই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নেও তারা এক হতে পারে না। বস্তুত অনেকের কাছে দলীয় স্বার্থ পেশাগত স্বাধীনতা থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই সংবাদ পরিবেশনে সততা, নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতা হয়ে পড়েছে দলবাজির বলি। সম্প্রতি বিশেষত গত জোট সরকারের আমলে দলীয় বিবেচনায় সংবাদমাধ্যম শুরুর লাইসেন্স বা অনুমতিপত্র প্রদান এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। ২০০৬ সালে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের বিরুদ্ধে সরকারের প্রতি অনুগত কতকগুলো সংবাদমাধ্যমের অপপ্রচার ছিল, যার একটি নগ্ন দৃষ্টান্ত। এ ছাড়া সাংবাদিকদের অনেক সময় মালিকের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার জন্য সততা ও পেশাগত নিরপেক্ষতাকে বাধ্য হয়ে জলাঞ্জলি দিতে হয়। সাংবাদিকদের দলপ্রীতি ও মালিকের স্বার্থরক্ষার প্রচেষ্টা তাদের পাঠক ও দর্শকদের প্রতি দায়বদ্ধতার সম্পর্ককে চরমভাবে বিঘ্নিত করে।

সরকারি সংবাদমাধ্যমেও অনেক সময় যোগ্যতা-দক্ষতার বাছবিচার না করেই দলীয় বিবেচনায় সংবাদকর্মীদের নিয়োগ ও চাকরিচ্যুত করা হয়। অন্যায়ভাবেই অনেক ক্ষেত্রে চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) কর্মরত ১৮ জন সংবাদকর্মীকে বরখাস্ত করা হয়, যা পরে হাইকোর্ট বেআইনি বলে ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের রায়ের পর সরকারের আপিলের কারণে এ পর্যন্ত তাঁরা চাকরিতে পুনর্বহাল হননি। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং এর পেশাগত মান উন্নত করতে হলে এ ধরনের কার্যকলাপ বন্ধ হওয়া জরুরি।

সাংবাদিকদের বেতনকাঠামো ও অন্যান্য প্রাপ্ত সুবিধার অপ্রতুলতাও তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধক। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত অনেকে, বিশেষত অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল গণমাধ্যমের কর্মীরা সরকার ঘোষিত বেতনকাঠামো রোয়েদাদ অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পায় না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত বেতন-ভাতা থেকেও তারা বঞ্চিত। ফলে তাদের পক্ষে পরিপূর্ণভাবে পেশাদারিত্ব প্রদর্শন ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ থাকে না। মফস্বলের সাংবাদিকদের জন্য এ সমস্যা আরও প্রকট। অনেক মফস্বল সংবাদদাতার অভিযোগ যে তাদের নিয়মিত সংবাদকর্মী হিসেবেও বিবেচনা করা হয় না। নিয়োগদাতার কাছ থেকে একটি পরিচয়পত্রের বেশি কিছু পায় না তারা। এ ছাড়া মফস্বলের সাংবাদিকেরা প্রভাবশালী মহল কর্তৃক অনেক বেশি চাপের মধ্যে থাকে। ফলে তাদের পক্ষে অনেক সময় সততা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি পর্বতপ্রমাণ বাধা হলো দেশের অসংখ্য নামসর্বস্ব পত্রিকা ও সাময়িকী। এসব সাময়িকী নাগরিকদের, বিশেষত সমাজে সুপরিচিত নাগরিকদের সম্পর্কে বানোয়াট, শালীনতাবিবর্জিত, কুরুচিপূর্ণ, অনেক ক্ষেত্রে চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করে বা প্রকাশের হুমকি দিয়ে মানসিকভাবে মানুষকে জিম্মি করায় লিপ্ত হয়। শোনা যায়, বর্তমান জরুরি অবস্থা জারির পর এমন ধরনের চাঁদাবাজি লাগামহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে এবং এটিকে অনুমতিপত্র হিসেবে ব্যবহার করে তারা তা করছে। এসব স্বার্থান্বেষী চক্র থেকে কেউই নিরাপদ নয়, এমনকি বর্তমান লেখকও এদের অপকর্মের শিকার হন। নিরপরাধ নাগরিকেরা এ ধরনের অপকর্মের প্রতিকারের জন্য দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতে মানহানির মামলা করতে পারে, যা একটি দীর্ঘসূত্রতামূলক প্রক্রিয়া। বিকল্প হিসেবে তারা প্রেস কাউন্সিলের শরণাপন্ন হতে পারে, কিন্তু প্রেস কাউন্সিলের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। আইনানুযায়ী এর শুধু সতর্ক, ভর্ৎসনা ও তিরস্কার করার ক্ষমতা রয়েছে; গুরুতর অপরাধের জন্য যা অত্যন্ত লঘুদণ্ড।

জনস্বার্থ রক্ষার্থে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে সাংবাদিক নামধারী অসৎ ও বিপথগামী কর্তৃক নাগরিকের মানমর্যাদা নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করা আবশ্যক। এ জন্য প্রেস কাউন্সিল আইনের সংস্কার ও এর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা অতি জরুরি বলে অনেকে মনে করে। বস্তুত, একজন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশিষ্ট নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সংবাদমাধ্যমের ‘সেল্ফপুলিশিং’য়ের কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। এ ব্যাপারে আইনের খসড়া তৈরি আছে বলেও শোনা যায়। আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে মনোযোগ দেবে এবং সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা রক্ষা কমিটি এ ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ নেবে।

পরিশেষে, এটি সুস্পষ্ট যে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে জনগণ ও নাগরিকদের অধিকার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সংবাদমাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করার কোনো বিকল্প নেই। নবগঠিত সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা রক্ষা কমিটি এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আমরা নিশ্চিত যে কমিটি এ ব্যাপারে সরকারের ওপর প্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করবে। তারা সাংবাদিকদের জন্য সম্মানজনক বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা যাতে নিশ্চিত হয় এবং তাদের পেশাগত মান যাতে উন্নত হয়, সেদিকে দৃষ্টি দেবে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চা উৎসাহিত করতে তারা সাংবাদিকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করবে। এ ছাড়া সাংবাদিকতার খোলসে যেসব তথাকথিত সংবাদমাধ্যম নাগরিকের মানমর্যাদাকে জিম্মি করে বেআইনি কাজে লিপ্ত, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসবে বলে আমরা আশা করি। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দাবি আরও জোরদার করতে হলে সংবাদ পরিবেশনায় বস্তুনিষ্ঠতা, নিজেদের মধ্যকার আগাছা পরিষ্কার ও দায়বদ্ধতা, বিশেষত পাঠক, দর্শক ও শ্রোতাদের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। প্রেস কাউন্সিলের আইনের সংস্কার ও কাউন্সিলকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্ষমতায়িত করা হতে পারে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো, ২ জুলাই ২০০৮

No comments:

Post a Comment