May 21, 2013

পঞ্চদশ সংশোধনীর পরিণতি শুভ হবে না

গত ৩০ জুন আমাদের জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল ২৯১-১ ভোটে পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে মোটা দাগে সংবিধান থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ পড়ে গেল। স্থায়িত্ব পেল রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম; সংযুক্ত হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা; স্বীকৃতি পেল বল প্রয়োগ করে সংবিধান সংশোধন, বাতিল, স্থগিত ও সংবিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থাহীনতা সৃষ্টি ইত্যাদি এবং এ কাজে সহযোগিতা বা উসকানি প্রদান ও সমর্থন রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে; অবৈধ হলো সংবিধানের কিছু অংশ সংশোধন; বর্ধিত হলো সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন আরও পাঁচটি; বাতিল হলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার ইত্যাদি ইত্যাদি।

সংবিধানে এসব পরিবর্তনের দুটি দিক রয়েছে। একটি পদ্ধতিগত, আরেকটি সংবিধান সংশোধনের বিষয়বস্তু-সম্পর্কিত। এই দুটি দিক নিয়ে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যেই নয়, অনেক নাগরিকের মনেও গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বস্তুত, আমাদের আশঙ্কা, এসব পরিবর্তনের পরিণতি অশুভ হবে।

সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের পদ্ধতির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া যাক। ২০১০ সালের ২১ জুলাই সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়, যাতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না—সরকারের পক্ষ থেকে সদস্যপদ দেওয়া হলেও বিরোধী দল তা গ্রহণ করেনি। কমিটি ২৭টি বৈঠক করা ছাড়াও রাজনৈতিক দল, একদল বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্টজনদের মতামত নেয়। কিন্তু এসব ব্যক্তির কোনো সুপারিশ না রেখেই কমিটি তার রিপোর্ট চূড়ান্ত করে (যুগান্তর, ১ জুলাই ২০১১)। প্রসঙ্গত, বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের অধিকাংশই বিরোধী দলকে সম্পৃক্ত করার পক্ষে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করার ও ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে রাখার বিপক্ষে অবস্থান নেন।

গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, কমিটির চূড়ান্ত করা রিপোর্টে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ছিল। উদাহরণস্বরূপ, গত ২৭ মের সমকাল-এর হেডলাইন ছিল ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার রেখেই সংবিধান সংশোধন হচ্ছে’। অন্য সব জাতীয় দৈনিকও প্রায় একই হেডলাইন করেছিল। কিন্তু কমিটি ৩০ মে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর প্রেক্ষাপট বদলে যায় এবং কমিটির অবস্থান দাঁড়ায় ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার সুযোগ নেই’ (প্রথম আলো, ৩১ মে ২০১১)। কমিটির একাধিক সদস্য অবশ্য এ ব্যাপারে তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে সংবাদপত্রে রিপোর্ট বেরিয়েছে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ দিয়ে গত ৮ জুন প্রকাশিত ৫১টি সুপারিশসংবলিত কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট সংসদে উত্থাপন করা হয়।

কমিটির সুপারিশগুলো গত ২০ জুন মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে এবং চার দিন পর এগুলো ২৫ জুন বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হয়। একই দিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য দুই সপ্তাহের সময় দিয়ে আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে এটি পাঠানো হয়। কমিটি চারটি উপদফা যুক্ত করার সুপারিশ করে মোট ৫৫টি দফাসংবলিত প্রতিবেদন দেয় ২৯ জুন। পরদিন, অর্থাৎ সংসদে উত্থাপনের পাঁচ দিনের মাথায় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিলটি পাস হয়।

সংবিধান একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং এটি জাতির জন্য ধ্রুবতারার সমতুল্য। এটি কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়। তাই জাতীয় মতৈক্যের ভিত্তিতেই সংবিধান সংশোধন আবশ্যক। কিন্তু সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়েছে একতরফাভাবে, অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে এবং অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে; বিরোধী দলের সম্পৃক্ততা ছাড়া ও বিশিষ্টজনদের মতামত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই। বিএনপি অবশ্য সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবেই সংসদ বর্জন করছে এবং সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে দূরে রেখেছে।

আরেকটি বিরাট পদ্ধতিগত ত্রুটি হলো, সংশোধনীটি পাস করার ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় সংসদ এবং আইন ও সংসদবিষয়ক স্থায়ী কমিটি তাদের যথার্থ দায়িত্ব পালন করেনি। সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় সব ক্ষমতা বিভাজিত হয় তিনটি বিভাগের মধ্যে: নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগ। এই তিনটি প্রতিষ্ঠান স্বাধীন সত্তার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও পরস্পরের ওপর নজরদারির বিষয় রয়েছে। এর মাধ্যমেই একটি ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস’ পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হয়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করার ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ হিসেবেই কাজ করেছে।

সংশোধনীর বিষয়বস্তুর বিষয়ে আসা যাক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে উচ্চ আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে আদালতের রায় এখনো প্রকাশিতই হয়নি। আদালত গত ১০ মে ঘোষিত তাঁর সংক্ষিপ্ত আদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে ‘প্রসপেক্টিভলি’ বা ভবিষ্যতের জন্য অবৈধ ঘোষণা করে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার খাতিরে এটি আরও দুই মেয়াদ (টার্ম) রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। অর্থাৎ আদালত অতীতের এবং আগামী দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে ‘কনডোন’ বা মার্জনা করেছেন। তাই আদালতের রায়ের অজুহাত দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা জনগণের চোখে ধুলা দেওয়ারই শামিল।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল আমাদের এক ভয়াবহ সংকটের দিকে ধাবিত করতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন ছিল রাজনৈতিক দলের পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসের এবং দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়—জনগণের বিরাট অংশের এমন ধারণারই ফসল। এর জন্য আরও দায়ী নির্বাচন কমিশনের অকার্যকারিতা, রাজনৈতিক দলের অসদাচরণ ও বিধিবিধানের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং প্রার্থীদের যেকোনো মূল্যে নির্বাচনে জেতার মানসিকতা। এ অবস্থার পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি হয়নি। যেমন: নবম জাতীয় সংসদ অনুমোদিত ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২’ অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা, অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন ও বিদেশি শাখার বিলুপ্তি বাধ্যতামূলক হলেও আমাদের নির্বাচন কমিশনের পক্ষে, রাজনৈতিক দলগুলোর রক্তচক্ষুর কারণে এগুলো কার্যকর করা সম্ভবপর হয়নি। তাই ভবিষ্যতে সৎ, যোগ্য ও নির্ভীক ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেওয়াসহ কমিশনকে সত্যিকারার্থে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা না হলে, রাজনৈতিক দলের ও তাদের প্রার্থীদের সদাচরণ নিশ্চিত করা না গেলে এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষ না হলে, তথা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন না এলে দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণার মধ্যে একটি গোঁজামিল রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা এবং কোনো ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান—এই দুটি বিষয় একসঙ্গে হতে পারে না। এ ছাড়া ধর্ম একটি বিশ্বাস, প্রতিষ্ঠান নয়; এবং এর রাষ্ট্রীয়করণ অযৌক্তিক। উপরন্তু, একযোগে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান (অনুচ্ছেদ ১০), ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বজায় রাখা (অনুচ্ছেদ ২ক) এবং ১২ অনুচ্ছেদে ‘রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদাদান’ ও ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার’ নিষিদ্ধ করা চরমভাবে স্ববিরোধী।

সংবিধানে ৭ক অনুচ্ছেদ সংযোজন একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলে আমাদের ধারণা। এই অনুচ্ছেদে অবৈধ ক্ষমতা দখল করে সংবিধান বাতিল ও স্থগিত করাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ‘সংবিধান বা ইহার কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে’ তা-ও রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে। এই দুটি কাজে কেউ ‘সহযোগিতা বা উসকানি প্রদান’ কিংবা ‘সমর্থন বা অনুসমর্থন করিলে’ সেই ব্যক্তিও একই অপরাধে অপরাধী হবেন। এই বিধান নাগরিকের বাকস্বাধীনতার ওপর একটি নগ্ন হামলা এবং যেকোনো প্রতিবাদী নাগরিক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এটি অতি সহজেই ব্যবহার করা যাবে। আর আওয়ামী লীগ যদি চিরদিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত না থাকে, তাহলে এটি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও ব্যবহূত হতে পারে, যেমনিভাবে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই তাঁদের সময়কার করা বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে বছরের পর বছর জেল খেটেছিলেন।

সাধারণত সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন করা যায় না। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫০টির বেশি অনুচ্ছেদকে, যার মধ্যে জাতির পিতার ছবি টাঙানোর বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত, সংশোধনের অযোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এতগুলো অনুচ্ছেদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না এবং নয়ও। আর এই বিধানের মাধ্যমে ‘জুডিশিয়াল রিভিও’ বা আদালতের পর্যালোচনার ক্ষমতাকেও খর্ব করা হয়েছে বলে অনেকের বিশ্বাস। ফলে আমাদের সংবিধানে চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস পদ্ধতি—যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত—আর রইল না।

পরিশেষে, আমরা মনে করি যে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলুপ্তি ভবিষ্যতের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে একটি পর্বতপ্রমাণ বাধা সৃষ্টি করবে, যা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য একটি চরম অশনিসংকেত। এ ছাড়া একযোগে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার বিধান ফিরিয়ে আনা, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে অব্যাহত রাখা এবং কোনো ধর্মকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদাদান ও রাজনৈতিকভাবে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা একধরনের চরম জগাখিচুড়ি। উপরন্তু, সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশকে সংশোধন অযোগ্য করে আমাদের সংবিধানের চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস পদ্ধতিকেই ভেঙে ফেলা হয়েছে। সর্বোপরি পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি কালো বিধান। আর পুরো প্রক্রিয়াই পরিচালিত হয়েছে অনেকটা অস্বচ্ছ ও অগণতান্ত্রিকভাবে, যে প্রক্রিয়ায় সংসদ ও সংসদীয় কমিটি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি।

সূত্র: প্রথম আলো, ১২ জুলাই ২০১১

No comments:

Post a Comment