May 6, 2013

রাজনীতির গুণগত মান উত্তরণ কোন পথে?

গত ২০ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের পক্ষে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা উপজেলা ও জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন। দেশের আপামর জনসাধারণেরও কামনা, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশ গ্রহণেই ১৮ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সরকারও কয়েক সপ্তাহ থেকেই রাজনৈতিক নেতাদের গণহারে কারামুক্তির শুরু থেকেই −− বলে আসছে যে, সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে; এখন তারা রাজনীতির গুণগত উত্তরণ ঘটাতে কাজ করছে।


সরকারের এ প্রচেষ্টা কি সফল হবে? কোন পথেই বা তা সম্ভব? প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর খোঁজার জন্য আমরা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চারটি সিটি করপোরেশন ও নয়টি পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকাতে পারি। এসব নির্বাচনে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রতিনিধিদের নির্বাচিত হয়ে আসার ব্যাপারে ব্যাপক জন-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হলেও এগুলোর ফলাফল অনেককে হতাশ করেছে। নির্বাচনগুলোতে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগে অভিযুক্ত অনেকেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। কেন তা হয়েছে তা অনুধাবন করা প্রয়োজন।

সিটি ও পৌরসভা নির্বাচনে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নির্বাচিত হওয়ার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এর একটি কারণ হলো, সরকার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো দ্রুততার এবং একই সঙ্গে নিরপেক্ষতার সঙ্গে নিষ্পত্তি করে দোষী ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারেনি। নির্বাচন কমিশনও প্রার্থীদের প্রদত্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করে অসত্য তথ্য প্রদানকারী ও তথ্য গোপনকারীদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে, যদিও এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনাও ছিল। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়নি− তারা বিতর্কিত ব্যক্তিদের মনোনয়ন ও সমর্থন করতে দ্বিধা করেনি।

তবে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নির্বাচিত হওয়ার পেছনে বড় কারণ আমাদের সমাজে বিদ্যমান সামন্তবাদী প্রথা। ব্রিটিশদের বিতাড়িত করে ১৯৪৭ সালে আমাদের পূর্বসূরিরা ‘রাজা-প্রজা’ সম্পর্কের অবসান ঘটিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টি করে আমরা জনগণকে ‘প্রজার’ পরিবর্তে, স্বাধীন দেশের ‘নাগরিক’ এ পরিণত করেছিলাম। কিনতু দুর্ভাগ্যবশত এসব পরিবর্তন সত্ত্বেও বিরাজমান প্রভুত্বের কাঠামোর অবসান ঘটেনি। অতীতের রাজা-প্রজার সম্পর্কের পরিবর্তে প্রভুত্বের কাঠামো রূপান্তরিত হয়েছে একটি নতুন ‘পেট্রন-ক্লায়েন্ট’ সম্পর্কে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মালিক তার নাগরিকেরা। আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। মালিক হিসেবে নাগরিকের কতগুলো অধিকার থাকে। সংবিধানের তৃতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ২৬ থেকে ৪৭) নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের কথা বলা আছে। এ ছাড়া সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগেও ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ শিরোনামে আরও অনেকগুলো নাগরিক অধিকারের কথা উল্লেখ রয়েছে। উপরনতু, নাগরিকদের বিভিন্ন সরকারি ও সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান থেকেও বিভিন্ন ধরনের সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। যেমন, যোগ্যতা থাকলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার অধিকার, পুলিশ থেকে নিরাপত্তা সেবা পাওয়ার অধিকার, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে অনেকগুলো সেবা পাওয়ার অধিকার ইত্যাদি।

অধিকারের সঙ্গে অবশ্য থাকে দায়িত্ব। বস্তুত অধিকার আর দায়িত্ব মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দায়িত্ব ও কর্তব্যবিবর্জিত অধিকার মূল্যহীন। রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে নাগরিকের কর্তব্য হলো নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি নিবিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমষ্টির স্বার্থে কাজ করা, জাতি গঠনে অবদান রাখা, যাতে সমাজ সামনে এগিয়ে যেতে পারে। এমন দায়িত্ব পালনের ভিত্তি হলো দেশপ্রেম−আমাদের জাতীয় সংগীতে বর্ণিত ‘মা তোর বদনখানি মলিন’ হওয়ার ফলে সৃষ্ট যাতনা।

দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সাধারণ নাগরিকেরা তাদের সংবিধানস্বীকৃত ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে তাদের প্রাপ্য সেবা সচরাচর অধিকার হিসেবে পায় না। এ জন্য তাদের পেট্রনের আশ্রয় নিতে হয়। যেমন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া যায় না, যদি না ক্ষমতাসীন দলের নেতা-নেত্রীদের আশীর্বাদ বা তাদের সহযোগীদের অনুকম্পা অর্জন না করা যায়। পুলিশ থেকে সেবা কিংবা তাদের হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে হলেও ক্ষমতাধর পেট্রন কিংবা তাদের সহচরদের সহায়তা নিতে হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে প্রবেশাধিকারও সাধারণ মানুষের নেই। তাই সাধারণ নাগরিক রাষ্ট্র থেকে যেসব সুযোগ-সুবিধা ও সেবা পায় তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পেট্রনেজ বা ফায়দা হিসেবেই পেয়ে থাকে−ন্যায্য প্রাপ্য হিসেবে নয়। এসব প্রাপ্ত ফায়দা অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্য ও অন্যায় সুযোগ-সুবিধার রূপ নেয়।

‘অসহায়’ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পেট্রনদের পক্ষ থেকে অনেক সময় ভিক্ষা, অনুদান এবং সাহায্য-সহযোগিতাও দেওয়া হয়। এভাবে আমাদের দেশে সাধারণ নাগরিকেরা হয়ে পড়েছেন ক্ষমতাধর পেট্রনদের অনুগ্রহের পাত্রে। এ কারণেই আমাদের একজন রাজনৈতিক নেতাকে বলতে শুনেছি, ছাগলদের কাঁঠালপাতা দিলেই তারা খুশি। অথচ ‘ভিআইপি’ নাগরিকেরা প্রভাব খাটিয়ে তাঁদের ন্যায্য অধিকারই শুধু নয়, তাঁরা তার চেয়ে অনেক বেশি আদায় করেন। ফলে আমাদের সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। তবে এ কথা না বললেই নয়, স্বাধীন দেশে নাগরিকদের মধ্যে অসমতা এবং ভিআইপি নাগরিক থাকার কোনো সুযোগ নেই।

স্নরণ করা যেতে পারে, ব্রিটিশ প্রভুদের ভারত ত্যাগের পর যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা অপূর্ণ থাকেনি ‘স্বাধীন’ পাকিস্তানে। সে শূন্যতা পূরণ হয় মূলত একদল প্রভাবশালী ভূস্বামী দ্বারা যাঁরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশেও এ অবস্থার নড়চড় হয়নি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত প্রভুত্বের কাঠামোকে ভাঙার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নেওয়া হয়নি সাধারণ নাগরিকদের ক্ষমতায়িত করে সমতা অর্জনের এমন কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়নি সর্বজনীন শিক্ষার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের চোখ-কান খোলার এবং তাদের চেতনার স্তর উন্নীত করার। বস্তুত অতীতের প্রভুত্বের কাঠামো আরও জোরদার হয় স্বাধীন বাংলাদেশে, বিশেষত গত দেড় দশকের গণতান্ত্রিক শাসনামলে এ প্রক্রিয়ায় আমাদের রাজনীতিবিদেরা পরিণত হন নব্য প্রভুতে। আর দলবাজি ও ফায়দা প্রদানের রাজনীতির মাধ্যমেই এ কাঠামো ক্রমাগতভাবে জোরদার হতে থাকে। দলীয় সাধারণ সম্পাদককে ‘মধুর-হাঁড়ি’ সমতুল্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে এ জোরদারকরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হয়।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনে সামন্তবাদী এ প্রভুত্বের কাঠামোরই বিজয় হয়েছে। সাধারণ জনগণ এ কাঠামোর প্রতিভূ তাদের পেট্রনদেরই ভোট দিয়েছেন। যাঁরা বেশি পেট্রনেজ বা ফায়দা ও নিরাপত্তা অতীতে দিয়েছেন কিংবা ভবিষ্যতে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন বলে ভোটাররা মনে করেন, তাঁদের পক্ষেই তাঁরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, ভোটাররা তাদের ‘আপনজন’দেরকেই, যাঁদের কাছ থেকে তাঁরা বিপদে-আপদে সাহায্য-সহযোগিতা পান, তাঁদেরই তারা ভোট দিয়েছেন। বস্তুত প্রার্থীদের সততা ও যোগ্যতা সাধারণ ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় ছিল না−এগুলো তাদের জন্য বহুলাংশে অপ্রাসঙ্গিক।

নিঃসন্দেহে নিজেদের আপনজন হিসেবে পেট্রনদের ভোট প্রদান −নিতান্তই ব্যক্তিস্বার্থের বিবেচনায় − ভোটারদের দিক থেকে ‘যৌক্তিক’ সিদ্ধান্ত ছিল। কিনতু প্রার্থীর দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের রেকর্ড উপেক্ষা করা কি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল? অবশ্যই নয়। তবে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যেহেতু মালিকানাবোধ সৃষ্টি হয়নি, তাই তারা রাষ্ট্রের প্রতি কোনো দায়িত্বও অনুভব করে না। ‘নগদ যা পাই হাত পেতে নিই, বাকির খাতা শূন্য থাক’−এ মানসিকতাই তাদের মধ্যে কাজ করেছে। ফলে অনেকেই নগদ টাকা, শাড়ি-লুঙ্গি এমনকি বিড়ি-সিগারেটের বিনিময়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে গুরুতর প্রশ্ন: সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের মালিকানাবোধ না থাকলেও অন্যদের মধ্যে কি তা আছে? নব্য প্রভু-পেট্রনদের মধ্যে কি তা দৃশ্যমান? এ প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর নেতিবাচক না হয়ে পারে না। কারণ নাগরিক অর্থাৎ মালিকেরা কখনো নিজের ঘর লুট করে না বা নিজের স্বজনদের পাতের ভাত কেড়ে নেয় না, যা আমাদের বাঘা বাঘা নেতা-নেত্রীদের অনেকেই করছেন। তাই আজকের বাংলাদেশের সংকট মনে হয় মূলত ‘মালিকানার সংকট’। আমাদের সবার মালিকানা আজ প্রশ্নবিদ্ধ−আমরা সবাই যেন ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’-এর প্রজা!

উল্লেখ্য, মালিকানা সংকটের কারণেই আমাদের দারিদ্র্যের সমস্যা আজও ব্যাপক ও বৈষম্য প্রকট। এ অবস্থার প্রধান কারণ হলো, এ দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের মালিকানাবোধ নেই বলে জাতি গঠনে তারা দায়িত্ব অনুভব এবং পালন করে না। তাদের নিজ ভাগ্য গড়ার কারিগরে এবং সমাজ পরিবর্তনের রূপকারে পরিণত করার তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগও অদ্যাবধি গ্রহণ করা হয়নি। বস্তুত আমাদের দেশে উন্নয়ন একটি প্রশাসনিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ হয়ে পড়েছে উন্নয়নের সাবজেক্ট বা উপকারভোগীতে। এভাবে জাতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সাধারণ মানুষের মেধা, সৃজনশীলতা ও অবদান থেকে বঞ্চিত হয়েছি। প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধ থেকে আমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ বিপরীত−দেশের আপামর জনসাধারণের অংশগ্রহণ ও অবদানের ফলেই আমরা মাত্র নয় মাসে দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিলাম।

এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার স্বাভাবিকভাবে তাদের প্রাপ্য হিসেবে প্রদান না করে, ফায়দা হিসেবে বিতরণ করতে গিয়ে যে ‘পেট্রনেজ চেইন’ বা ফায়দার শেকল তৈরি হয়েছে−বিশেষত নব্বইয়ের পর থেকে, তাতে একদিকে পুরো জাতি দুটি যুদ্ধংদেহী ক্যাম্পে বিভক্ত হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ফায়দার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আমাদের দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আধিপত্য আরও নিরঙ্কুশ হয়েছে তাঁদের অনুসারীদের ওপর। তাঁরা অনেকটা বিশাল বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছেন, যে বৃক্ষের আশপাশে পরগাছা ছাড়া কিছুই গজায় না। আবার কারও কারও মতে, তাঁরা ‘সম্রাজ্ঞী’র আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে পড়েছেন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ দুর্নীতির জন্ন দেয়, আর নিরঙ্কুশভাবে কেন্দ্রীকরণ দুর্নীতিকে লাগামহীন পর্যায়ে নিয়ে যায়। এভাবেই দেশের জনগণের ওপর দুঃশাসনের এক জগদ্দল পাথর চেপে বসেছে।

ক্ষমতার নিরঙ্কুশভাবে কেন্দ্রীকরণের তাৎপর্য অত্যন্ত ভয়াবহ। এক বনে যেমন দুই বনরাজ সিংহ বাস করতে পারে না, তেমনিভাবে একই রাষ্ট্রে প্রবল ক্ষমতাধর দুই নেত্রীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান অত্যন্ত দুরূহ। তাই তাদের মধ্যে সমঝোতা, এমনকি কথাবার্তা হওয়ার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ বলেই অনেকের ধারণা। যা ‘তিন জোটের রূপরেখা’র মাধ্যমে করা সম্ভব হয়েছিল, তা আজ অসম্ভব বলে মনে হয়। এ ছাড়া নিরঙ্কুশ ক্ষমতার কারণে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনই এখন আর তাদের উভয়ের সম্মতি ছাড়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের এবং বাংলাদেশের ১৫ কোটি জনগণের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আমাদের দুই নেত্রীর প্রজ্ঞা ও বিশালত্বের ওপর−‘বটম-আপ’ বা নিচের থেকে কোনো পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আজ দুরাশা মাত্র। তাই রাজনীতির গুণগত উত্তরণ এখন মূলত আমাদের নেতৃদ্বয়ের ওপরই নির্ভর করে। দুর্ভাগ্যবশত, এ ধরনের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তবে আশার কথা যে, আমাদের নেতৃদ্বয় তাদের গুরুদায়িত্বের কথা অনুভব করতে পারছেন বলে মনে হয়। তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও তাদের দলের সংস্কারের কথা ক্ষীণ কণ্ঠে হলেও বলা শুরু করেছেন। তারা নিজের রক্তের সম্পর্কের বাইরে উত্তরাধিকারের কথা ভাবেন বলে শোনা যায়। তারা চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তদের দল থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলছেন। তারা একত্রে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে কেউ কেউ দাবি করছেন। তারা সৎ ও যোগ্য প্রার্থী খুঁজছেন বলেও সংবাদপত্রে রিপোর্ট বেরিয়েছে, যে দাবি নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আমরা বহুদিন ধরেই করে আসছি। এসব শুনে আমরা সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে ক্ষীণ হলেও আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। তবে আমাদের রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের জন্য বিদ্যমান সামন্তবাদী কাঠামোর পরিবর্তন আবশ্যক−আবশ্যক বর্তমানে ‘ভেড়ার পাল’ হিসেবে বিবেচিত নামমাত্র নাগরিকদের মালিকের আসনে অধিষ্ঠিত করা। আরও আবশ্যক তাদের অধিকার সচেতন ও দায়িত্বপরায়ণ ‘যোগ্য’ নাগরিকে পরিণত করা, যা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০০৮

No comments:

Post a Comment