May 14, 2013

রাজনীতি: আ.লীগ-বিএনপি দ্বন্দ্বের অবসান জরুরি

গত ৫ ডিসেম্বর ২০০৯ প্রথম আলোতে প্রকাশিত নিবন্ধে অধ্যাপক এম এম আকাশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্দ্বের স্বরূপ তুলে ধরেছেন এবং এর সম্ভাব্য পরিণতির ওপর আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে ‘ক্ষমতার প্রশ্ন ছাড়া মৌলিক কোনো দ্বন্দ্ব নেই’। উপরিকাঠামোর কিছু ইস্যুতে যেটুকু পার্থক্য আছে, যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যাওয়ার চরম প্রতিযোগিতার কারণে তাও ধীরে ধীরে দূরীভূত হয়ে যাচ্ছে। অধ্যাপক আকাশের এ বক্তব্যের সঙ্গে আমার কোনো দ্বিমত নেই। কারণ বৃক্ষের পরিচয় ফলে—দুটি দলের কার্যক্রমের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে তাদের মধ্যে তেমন মৌলিক কোনো তফাত নেই।

তবে অধ্যাপক আকাশ এ দ্বন্দ্বের একটি ‘পপুলিস্ট’ বা লোকরঞ্জনকারী ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা অসম্পূর্ণ বলে আমার ধারণা। তিনি বলেছেন, মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী ও সামরিক বাহিনীর মধ্যকার উচ্চাভিলাষী জেনারেলরাই তথাকথিত বুর্জোয়া গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু। এটি আংশিক সত্য। আমি মনে করি, এ দুটোর সঙ্গে গণতন্ত্রের আরও ভয়াবহ শত্রু হলো ‘নির্বাচনসর্বস্ব’ গণতন্ত্র নিজেই; এবং আমাদের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল নিজেরা, তাদের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বিরোধ ও গোত্রতন্ত্রের চর্চা।

পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে লক্ষ করা যায়, গত শতাব্দীতে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার তিনটি ‘ওয়েভ’ বা ঢেউ উঠেছিল—প্রথম দুটি ছিল দুটি বিশ্বযুদ্ধ, তৃতীয়টি ছিল বার্লিন ওয়াল ভাঙার ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর। এসব অনেক দেশেই নির্বাচনসর্বস্ব গণতন্ত্র টিকে থাকেনি। সত্যিকারের উদারনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সম্মতির শাসন কায়েম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন তাদের জন্য সমতা ও সমসুযোগের অধিকার প্রতিষ্ঠার। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়নি; বরং হয়েছে নাগরিকদের অধিকার পদদলিত। স্লোগানসর্বস্ব সমাজতন্ত্র ও লাগামহীন পুঁজিবাদের চর্চার কারণে সাধারণ মানুষ চরমভাবে বঞ্চিত হয়েছে এবং ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ক্রমাগত বেড়েছে। গণতন্ত্রের এ মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো অপূর্ণ থাকার কারণে এসব দেশের শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার রদবদল হলেও এগুলোকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিকই বলা যায় না। তাই অভিজ্ঞতা বলে, সত্যিকারের গণতন্ত্রের একটি বড় শত্রু আংশিক বা ‘এক দিনের’ গণতন্ত্র।

সত্যিকারের গণতন্ত্রচর্চার অনুপস্থিতি ছাড়াও গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার উদ্যোগ সামান্যই এসব দেশে পরিলক্ষিত হয়েছে। গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার জন্য প্রয়োজন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বিকেন্দ্রীকরণ ও তৃণমূলের গণতন্ত্রচর্চার মাধ্যমে সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম করা, যাতে সংসদভিত্তিক গণতান্ত্রিক উপরিকাঠামোর জন্য প্রয়োজনীয় ‘খুঁটি’ সৃষ্টি হয়।

গণতন্ত্রের ভিতকে সুদৃঢ় করার জন্য একই সঙ্গে প্রয়োজন কতগুলো শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান। যেমন জাতীয় সংসদ, আদালত, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন ইত্যাদি—যেগুলো জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে স্বাধীনভাবে কাজ করবে। যেমন, সাংসদেরা (নিজেদের শপথ ভঙ্গ করে) ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থের পরিবর্তে জনস্বার্থে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত হলে, সংসদ ‘রাবার স্ট্যাম্পিং’ প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে স্বাধীনভাবে কাজ করলে এবং সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি পরিহার করলে, এককথায় সংসদ কার্যকর হলে, সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সত্যিকারের গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দল—গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ রাজনৈতিক দল। বস্তুত রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের চালিকাশক্তি। নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত ব্যক্তিরা ক্ষমতায়িত হলেও এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের প্রাপ্ত ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।

বাংলাদেশেও অতীতে দুই-দুইবার গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছিল, যা স্থায়ী হয়নি। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকেনি। একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতে ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, পরবর্তী দুটি মোটামুটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পর ক্ষমতার বদল ঘটানো সত্ত্বেও, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাতিলের মাধ্যমে মুখ থুবড়ে পড়ে। এই দুটি ব্যর্থতার কারণও মূলত আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় করাতে ব্যর্থতা। বহুতলবিশিষ্ট একটি ইমারতের ভিত গভীরে প্রোথিত না হলে সেটি যেমন একটু ঝড়-ঝাপটাতেই ধূলিসাত্ হতে পারে, তেমনি দৃঢ় ভিতের অনুপস্থিতিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও ভেঙে পড়তে পারে। প্রসঙ্গত, আরেকটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে প্রায় এক বছর আগে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনঃপ্রবর্তন ঘটলেও এটিকে সুদৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় করানোর তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ আজও লক্ষ করা যাচ্ছে না। ফলে আমরা আবারও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছি বলেই অনেকের আশঙ্কা।

গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে, বিশেষত সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে। কারণ, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাসীন দলের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার—নির্বাচনী ইশতেহার দলের, সরকারের নয়—পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দলের।

রাজনৈতিক দল সৃষ্টি হয় কোনো আদর্শ বা সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ভিন্ন সময়ে দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল। আওয়ামী লীগের একটি বিরাট ঐতিহ্য ও স্বাধীনতা-সংগ্রামে অসামান্য অবদানও ছিল, কিন্তু একটি শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের যখন সুযোগ আসে, বিশেষত গত দেড় দশকে, তখন দলটির সঙ্গে বিএনপির তেমন কোনো পার্থক্যই লক্ষ করা যায়নি। সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে উভয় দলই প্রায় একই নীতি অনুসরণ করেছে। এ ছাড়া দল দুটির মাধ্যমে ব্যাপকভাবে দুর্নীতির ‘রাজনৈতিকীকরণ’ এবং রাজনীতির ‘দুর্নীতিকরণ’ করা হয়েছে।

এ ছাড়া অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্য থাকলেও, গত দেড় দশকে দলটি সে চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে বলেই মনে হয়। দলটি মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে হাত মেলাতেও দ্বিধা করেনি। এমনকি খেলাফত মজলিসের মতো সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য গড়ে তুলতেও কুণ্ঠা বোধ করেনি, যদিও প্রবল সমালোচনার মুখে দল তা বাতিল করতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান থাকা সত্ত্বেও এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্লোগান বারবার উচ্চারণ করলেও, সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হয়েছে। কারণ সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হলো সততা, সমতা, ন্যায়পরায়ণতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সহমর্মিতা, একতা ইত্যাদি।

দুটি দলের মধ্যে যে তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন নেই, এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। যেমন, প্রশাসনে দলীয়করণ, সংসদ বর্জন, আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন (যেমন—নির্বাচনী দলে গণতন্ত্রের চর্চা, সহযোগী সংগঠন বিলুপ্ত না করা), দলীয় ব্যক্তিদের মামলা প্রত্যাহার, দলের সঙ্গে জড়িত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে অনিচ্ছা (বরং তাঁদের পুরস্কৃতকরণ), দুর্নীতি দমন কমিশনকে অকার্যকরীকরণ (অন্তত প্রভাবিতকরণ), উচ্চ আদালতে দলীয় সমর্থকদের নিয়োগ প্রদান, স্বৈরাচারের সঙ্গে দহরম-মহরম, স্থানীয় সরকারকে অকার্যকরীকরণ, বিকেন্দ্রীকরণে অনীহা, প্রতিবাদীদের কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা, এমপিতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকরণ, এমপিদের সম্পদের হিসাব দিতে গড়িমসি, এমপিদের গাড়ি-বাণিজ্যে লিপ্ত হওয়া, পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পাঁয়তারা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকরণ (যেমন, নব্বইয়ের তিন জোটের অঙ্গীকার ভঙ্গকরণ), ক্রসফায়ার-রিমান্ডের মাধ্যমে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন ইত্যাদি ক্ষেত্রে দল দুটির মধ্যে তেমন কোনো তফাত নেই। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব গর্হিত আচরণই গণতন্ত্রকে ‘কনসলিডেট’ করার বা সুদৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় করানোর পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে।

আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সংকটে ফেলার ক্ষেত্রে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। বিচারপতি কে এম হাসানের সরে দাঁড়ানোর পরও আওয়ামী লীগের ২২ জানুয়ারি ২০০৭-এ অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচন বর্জনের একটি বড় কারণ ছিল গত সরকারের আমলে প্রশাসনে ব্যাপক দলীয়করণ। প্রশাসনে দলীয়করণ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থেই একটি বড় বাধা। সফলভাবে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রায় ১০ লাখ ব্যক্তির প্রয়োজন, যাঁদের অধিকাংশই সরকারি কর্মকর্তা। এসব কর্মকর্তা নিরপেক্ষ না হলে, কারও পক্ষেই নিরপেক্ষভাবে ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সব ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ ক্ষমতাপ্রাপ্ত একটি সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও তা করা সম্ভব হবে না। তাই প্রশাসনের বর্তমানের ব্যাপক দলীয়করণ আমাদের পরবর্তী নির্বাচনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

নীতি ও কার্যক্রমের ক্ষেত্রে তেমন মৌলিক পার্থক্য না থাকা সত্ত্বেও, জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে দুটি দলই অত্যন্ত সক্রিয়। আর এ বিভাজন সৃষ্টি করা হচ্ছে ‘কৃত্রিমভাবে’, কতগুলো স্লোগান ও সিম্বল বা প্রতীকের মাধ্যমে। যেমন, বাঙালি বনাম বাংলাদেশি, জয় বাংলা বনাম বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, খোদা হাফেজ বনাম আল্লাহ হাফেজ, মুজিববাদ বনাম জিয়ার আদর্শ। দুর্ভাগ্যবশত এ বিভাজন সৃষ্টিতে দল দুটো ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধকেও সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ব্যবহার করছে। এর ফলে ১৯৭১ সালের একটি একতাবদ্ধ জাতি আজ আমরা চরমভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। এ ছাড়া আজ আমাদের জন্য দেশের থেকে দল, দলের থেকে গোত্র, গোত্রের থেকে ব্যক্তি বড় হয়ে গেছে।

সীমিতসংখ্যক আদিবাসী সম্প্রদায় ব্যতীত, যাদের পৃথক সত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আমরা চরম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছি—আমাদের মধ্যে জাতিগত কোনো বিভাজন নেই। আমরা মোটামুটি একই সত্তাসম্পন্ন জাতি—আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি এক—যার জন্য আমরা অনেকেরই ঈর্ষার কারণ হতে পারি। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কার দিকে তাকালেই জাতিগত বিভাজনের ফলে কী চরম সমস্যা, এমনকি সহিংসতার সৃষ্টি হতে পারে, তা আমরা দেখতে পাই। দুর্ভাগ্যবশত আত্মঘাতী দলতন্ত্রের কারণে আমরা একই জাতিসত্তাসম্পন্ন জাতির বিশেষ সুবিধা হারিয়ে ফেলেছি; বরং আমরা অযথা অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত এক চরম বিভাজিত জাতিতে পরিণত হয়েছি। পুরো জাতিই যেন দুটি কৃত্রিম ‘ক্ল্যানে’ বা গোত্রে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

সারা দেশেই আজ আমরা ‘গোত্রতন্ত্রের’ প্রতিফলন দেখতে পাই। অনেক এলাকায়ই আওয়ামী লীগ-বিএনপির জন্য ভিন্ন ভিন্ন চায়ের দোকান দেখা যায়। শুনেছি, কিছু কিছু জায়গায় এক দলের শ্যালো মেশিনের মালিক ভিন্ন দলভুক্ত মালিকের জমিতে পানি পর্যন্ত দেয় না। দলীয় নেতা-নেত্রীদের যুদ্ধংদেহী ও অর্বাচীন সিদ্ধান্তের (যেমন, নাম বদলানোর রাজনীতি) কারণে এ বিভাজন দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। এমনকি দলতন্ত্র ও গোত্রতন্ত্রের কারণে একে অপরের প্রতি ঘৃণাবোধও তৈরি হচ্ছে।

কেউ কি জানে, এর শেষ কোথায় এবং পরিণতি কী? আশা করি আমাদের সমাজবিজ্ঞানীরা ও অন্য বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে গবেষণা করে সমাধান বের করবেন। তবে পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, চরম বিভক্ত জাতি বেশি দূর এগোতে পারে না (যেমন শ্রীলঙ্কা, এমনকি আমরা নিজেরাও) এবং চরমভাবে বিভক্ত জাতি চরম সংকটে নিপতিত হয় (যেমন রুয়ান্ডা)। বলা বাহুল্য, চরম ঘৃণা থেকেই ক্ল্যান ওয়ার বা গোত্রীয় সংঘাতের সূচনা হয়।

সূত্র: প্রথম আলো, ৭ জানুয়ারি ২০১০

No comments:

Post a Comment