May 21, 2013

তেল-গ্যাস চুক্তি নিয়ে বিতর্ক ও এর যৌক্তিকতা

আমাদের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির বিরোধিতাকারীদের গালাগালের আশ্রয় নিয়েছেন। আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, যে ব্যক্তির যুক্তি দুর্বল, সে-ই সাধারণত অশালীন আচরণ করে কিংবা তার কণ্ঠ উঁচু হয়। আর গণতন্ত্রের মূল কথা হলো, প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা রক্ষার ‘মূল্য’ দিতে হয় নাগরিকের অতন্দ্রপ্রহরীর ভূমিকার মাধ্যমে।

গত ১৬ জুন পেট্রোবাংলা তথা বাংলাদেশ সরকার মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে ‘প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট’ (পিএসসি) বা উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। দেশের সীমানাভুক্ত ‘এক্সটেন্ডেড কন্টিনেন্টাল সেলফ’ বা গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদন করা হলো চুক্তিটির উদ্দেশ্য। চুক্তি অনুযায়ী, গভীর সমুদ্রের ১০ ও ১১ নম্বর বল্গকের এক অংশে আগামী মার্চ-এপ্রিল মাসে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ শুরু করবে কনোকো।


১৯৭৪ সালে প্রথম পিএসসি স্বাক্ষরের ৩৭ বছর পর বাংলাদেশ তার গভীর সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করতে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ২৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ১০ ও ১১ ব্লকের মোট আয়তন ছয় হাজার ৭৬৩ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে কনোকো অনুসন্ধান চালাতে পারবে পাঁচ হাজার ১৬৫ বর্গকিলোমিটারে। বাকি এক হাজার ৬০৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে ভারত ও মিয়ানমারের আপত্তি রয়েছে, যেটি নিয়ে বর্তমানে জাতিসংঘে নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। চুক্তিভুক্ত এলাকায় পানির গভীরতা এক হাজার থেকে দেড় হাজার মিটার।

কনোকো শুরু থেকেই চুক্তি অনুযায়ী কাজের সূচি অনুসরণ না করলে তিন বছর পর এটি বাতিল হয়ে যাবে। আপত্তির কারণে কনোকোর কার্যক্রম বন্ধ হলে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে না কোম্পানিটি। কিন্তু দুর্ঘটনার জন্য ঠিকাদার কোম্পানির কাজে অবহেলা বা গাফিলতি থাকলে বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে। তবে এই ধারায় কোম্পানির ‘অদক্ষতা’র শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে (প্রথম আলো, ২৪ জুন ২০১১)। কিন্তু দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কনোকো ফিলিপসের ইতিহাস ভালো নয়। কালের কণ্ঠের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘রাজনীতি’তে প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে (২১ জুন ২০১১) কোম্পানিটিকে ‘দুর্ঘটনার রাজা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়।

অনুসন্ধান পর্যায়ে কনোকোকে বাংলাদেশের জনবল নিয়োগ করতে হবে পর্যায়ক্রমে নূ্যনতম ৫০ শতাংশ। উত্তোলন পর্যায়ে এই সংখ্যা পর্যায়ক্রমে হবে কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ।

কোনো তেল-গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে ঠিকাদার তার উন্নয়নের জন্য পেট্রোবাংলা বরাবর একটি পরিকল্পনা দাখিল করবে। ওই পরিকল্পনায় কূপ খনন, গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ পল্গান্ট নির্মাণ, পেট্রো বাংলার গ্যাস পরিমাপ ও গ্রহণের স্থান পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপন, দৈনিক গ্যাস উৎপাদন এবং আর্থিক বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পিএসসির আওতায় পরিচালিত সব কার্যক্রম পেট্রোবাংলা ও ঠিকাদার কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ কমিটির (জেএসসি) অনুমোদনক্রমে পরিচালিত হবে। ঠিকাদার কস্ট-রিকভারির মাধ্যমে বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পাবে।

চুক্তিটি নিয়ে ইতিমধ্যে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ‘তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’ ও কিছু বিশিষ্ট নাগরিক চুক্তিটিকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে আখ্যায়িত করে এটি প্রকাশ করার দাবি করেছে। এমনকি কমিটির পক্ষ থেকে হরতালও আহ্বান করা হয়েছে। পক্ষান্তরে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, চুক্তিটিতে জনস্বার্থবিরোধী কিছুই নেই এবং চুক্তির অধিকাংশই এর মধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে_ আর রাষ্ট্রের স্বার্থেই বাকি অংশ গোপন রাখা হয়েছে। সরকারের কিছু ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি অবশ্য প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে গাল-মন্দের আশ্রয় নিয়েছেন।

কেন চুক্তিটি নিয়ে বিতর্ক? বিতর্কের কারণ হলো লাভ-লোকসানের হিসাব। জাতীয় কমিটির মতে, চুক্তিটি থেকে বাংলাদেশ তেমন লাভবান হবে না। বরং এর মাধ্যমে মূল্যবান গ্যাস ও তেল সম্পদের মালিকানা বিদেশি কোম্পানির হাতে চলে যাবে এবং তারা এগুলো রফতানি করে লাভবান হবে। আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে।

এ ধরনের উৎপাদন বণ্টন চুক্তি থেকে ঠিকাদার হিসেবে কনোকো ফিলিপস, না ইজারা প্রদানকারী হিসেবে বাংলাদেশ বেশি লাভবান হবে, তা নির্ভর করবে মূলত পাঁচটি বিষয়ের ওপর : ১. অনুসন্ধান থেকে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের জন্য উপযোগী তেল-গ্যাস পাওয়া যাবে কি-না; ২. উত্তোলনের জন্য খরচের পরিমাণ; ৩. আবিষ্কৃত গ্যাসে কার শেয়ার কতটুকু থাকছে; ৪. কী দামে কতটুকু গ্যাস কার কাছে বিক্রি হচ্ছে এবং ৫. উত্তোলনের হারের ওপর।

অনুসন্ধান থেকে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস পাওয়া যাবে কি-না তা একটি বড় অনিশ্চয়তা। এ অনিশ্চয়তাই ঝুঁকির সৃষ্টি করে এবং বাংলাদেশের মতো কম সম্পদশালী দেশের জন্য এ ধরনের ঝুঁকি নেওয়া দুরূহ। তবে ব্লক ১০ ও ১১ থেকে সফলতা অর্জনের সম্ভাবনা বেশি বলে অনেকের ধারণা। কারণ পার্শ্ববর্তী কূপ থেকে ভারত ও মিয়ানমার সফলতা অর্জন করেছে (প্রথম আলো, ১৭ জুন ২০১১)। এ ছাড়াও ৬-৮ কোম্পানি বিডিংয়ে অংশ নিয়েছিল, এ তথ্য থেকেও কূপ দুটিতে গ্যাস-তেল পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে ধারণা করা যায়। তাই কনোকোর সঙ্গে দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো থাকার কথা।

উত্তোলনের জন্য খরচের পরিমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চুক্তিতে কস্ট-রিকভারির বিধান রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, এর জন্য উত্তোলনের ৫৫ শতাংশ নির্ধারণ রাখা হয়েছে। বাকি ৪৫ শতাংশ প্রফিট শেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ ও কনোকো ফিলিপসের মধ্যে ভাগ হবে। ব্যয় তুলে নেওয়ার পর ‘প্রফিট শেয়ার’ বা লাভের অংশ বাংলাদেশ পাবে (তেল বা কনডেনসেট হলে) ৬০ শতাংশ থেকে ৮৫ শতাংশ। আর গ্যাস হলে পাবে ৫৫ থেকে ৮০ শতাংশ (কনডেনসেট হলো গ্যাসের সঙ্গে থাকা তেল যা প্রক্রিয়াকরণ পল্গান্টে আলাদা করা হয়)। কিন্তু কোম্পানির খরচ বেশি হলে প্রফিট শেয়ারের অংশ কমে যাবে এবং কস্ট-রিকভারির সময়সীমাও বেড়ে যাবে। ফলে চুক্তি থেকে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার পরিমাণও কমে যাবে। তাই কনোকো ফিলিপসের পক্ষে খরচের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা থাকবে। তবে কনোকোর বাজেট ও সব ব্যয়ের পরিকল্পনা পেট্রোবাংলা ও কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত জেএসসির অনুমোদনক্রমে পরিচালিত হবে। এখানেই অনেকের ভয়। আমাদের দুর্নীতিগ্রস্ত ও দুর্বৃত্তায়িত ব্যবস্থায় উৎকোচের মাধ্যমে কোম্পানির পক্ষে খরচের অঙ্ক ম্যানিপুলেট করে অধিকাংশ উত্তোলিত গ্যাসের মালিকানা নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অর্থাৎ জেএসসির মনিটরদের মনিটর করবে কে? এ ছাড়াও কোম্পানি নিজেও খরচের মিথ্যা তথ্য দিয়ে কস্ট-রিকভারির সময়সীমা বাড়াতে পারে, যা করার সব ইনসেনটিভ তাদের থাকবে।

কস্ট-রিকভারির পর বাকি অংশ বিভিন্ন অনুপাতে বাংলাদেশ ও কনোকোর মধ্যে ভাগ হবে। এই অনুপাতগুলো দরকষাকষির বিষয় এবং দরকষাকষির ফলাফলের তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। যুক্তি দেওয়া হয় যে, এ তথ্য প্রকাশ করলে ভবিষ্যৎ পিএসসিতে এর চেয়ে ভালো টার্ম পাওয়া যাবে না। কিন্তু এ তথ্য প্রকাশ হলেই জানা যেত বাংলাদেশের স্বার্থ সমুন্নত রাখা, না জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। তবে ধারণা করা হয় যে, প্রফিট শেয়ারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অংশ হবে ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ কস্ট-রিকভারি পর্যায়ে বাংলাদেশের শেয়ার হবে ২২.৫ থেকে ৩৩.৭৫ শতাংশ।

দরকষাকষিতে আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। কাফকো, নাইকো এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে তখনকার ক্ষমতাসীনদের দ্বারা দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এ গর্হিত কাজে অনেক রথী-মহারথীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও কাফকো চুক্তিকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছে। তাই প্রফিট শেয়ার ভাগাভাগির তথ্য সংসদের অন-ক্যামেরা সেশনে বা গোপন বৈঠকে, অন্তত সংশিল্গষ্ট সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে ইনডিপেনডেন্ট রিভিউ হওয়া আবশ্যক। তবে সংসদীয় কমিটির সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরাও দাবি করছি চুক্তিটি প্রকাশের।

অনুসন্ধানে তেল-গ্যাস যা-ই পাওয়া যাক না কেন, প্রথমেই তা কনোকোর পক্ষ থেকে পেট্রোবাংলাকে নিতে বলতে হবে। গ্যাসের মূল্য নির্ধারিত হবে সিঙ্গাপুরের বাজারে উচ্চ সালফারযুক্ত জ্বালানি তেলের (এইচএসএফও) মূল্যের ভিত্তিতে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতি মেট্রিক টন এইচএসএফওরর্ স্বোচ্চ মূল্য বা সিলিং প্রাইস ১৮০ মার্কিন ডলার, সর্বনিম্ন মূল্য বা ফ্লোর প্রাইস ৭০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণত সিঙ্গাপুর তথা আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য সিলিং প্রাইস থেকে অনেক বেশি থাকে। উদাহরণস্বরূপ, গত এক মাসে সিঙ্গাপুরের বাজারে এইচএসএফওর দাম ৫৫০ থেকে ৬৫০ ডলার পর্যন্ত ওঠানামা করেছে (প্রথম আলো, ২৪ জুন ২০১১)। তাই অতীতের সবগুলো পিএসসির অধীনেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় কম দামে গ্যাস পায়।

পেট্রোবাংলা ছয় মাসের মধ্যে গ্যাস ক্রয়ের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত না দিলে বাংলাদেশের মধ্যে অন্য কোনো গ্রাহকের কাছে তা বিক্রি করতে পারবে কনোকো ফিলিপস। এ ছাড়া পেট্রোবাংলা না নিতে চাইলে কনোকো তার অংশের তেল বা গ্যাস দেশের মধ্যে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করতে পারবে। এরপর বিকল্প রফতানি।

স্বাভাবিকভাবেই ঠিকাদার চাইবে সর্বোচ্চ দামের্ স্বোচ্চ পরিমাণ গ্যাস বিক্রি করতে, যাতে তার পুঁজি ও মুনাফা দ্রুত উঠে আসে। চুক্তির ১৫.৫.৮ ধারায় বলা হয়েছে : ‘যে ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা স্থানীয় চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় পরিবহন ব্যবস্থা (পাইপলাইন) স্থাপন করতে পারবে সেক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা তার অংশের প্রফিট গ্যাস রাখার অধিকারপ্রাপ্ত হবে, তবে তা কোনোমতেই মোট ‘মার্কেটেবল গ্যাস’ (অর্থাৎ মোট উৎপাদিত গ্যাস = কস্ট-রিকভারি গ্যাস+কনোকো ফিলিপসের প্রফিট গ্যাস+পেট্রোবাংলার প্রফিট গ্যাসের ২০%-এর বেশি হবে না। প্রতি মাসে পেট্রোবাংলা যে পরিমাণ গ্যাস স্থানীয় ব্যবহারের জন্য রাখতে চায় কন্ট্রাকটরকে এলএনজি রফতানি চুক্তির আগে জানাতে হবে এবং প্রতিমাসে সংরক্ষিত চুক্তির পূর্ণ মেয়াদকাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। পেট্রোবাংলার অনুরোধে ১১তম বছরের শুরু থেকে উপরে বর্ণিত সংরক্ষিত গ্যাসের পরিমাণ শতকরা ২০ ভাগ থেকে বৃদ্ধি করে ৩০ ভাগ পর্যন্ত করা যাবে।’ অর্থাৎ চুক্তির মাধ্যমে প্রথম ১০ বছর ৮০ ভাগ গ্যাস রফতানি করার অধিকার কনোকো ফিলিপসকে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হবে বলে কনোকোও গ্যাস রফতানিতে প্রবলভাবে উৎসাহী হবে। চুক্তির শর্তগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে আরও দেখা যাবে যে, পেট্রোবাংলা এ রফতানি ঠেকাতে পারবে না। ফলে যদি সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ দিয়ে আমাদের অভাব না মেটে, তাহলে আমরা একই সঙ্গে এলএনজি করে গ্যাস রফতানি করব কম দামে এবং আমদানি করব অপেক্ষাকৃত বেশি দামে (দেখুন এমএম আকাশ, “মডেল পিএসসি-২০০৮ ‘সহজ পাঠের’ জটিলতা!” সাপ্তাহিক একতা, ২৬ জুন ২০১১)। মনে আছে, অতীতের গ্যাস রফতানির জন্য আন্তর্জাতিক চাপের কথা এবং আমাদের বিশেষজ্ঞদের কারও কারও এ লক্ষ্যে সুপারিশ!

আন্তর্জাতিক রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট চুক্তিনীতি অনুযায়ী কোম্পানি সর্বোচ্চ স্বীকৃত রিজার্ভের সাড়ে সাত ভাগ গ্যাস উত্তোলন করতে পারবে। যত কম উত্তোলন করা যায় আমাদের জন্য তত ভালো, কারণ তাতে রফতানির চাপ কমে যাবে, আমাদের রিজার্ভ মজুদ থাকবে এবং আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বেশি দিন গ্যাস ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু বিদেশি কোম্পানির জন্য বেশি হারে গ্যাস উত্তোলন করে রফতানি করলে তাদের বিনিয়োগের অর্থ ও লাভ দ্রুত উঠে আসবে। বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষার্থেই কি-না জানি না, আমাদের চুক্তিতে বলা আছে, ‘অফশোর ব্লকের ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার সম্মতিক্রমে শতকরা সাড়ে সাত ভাগেরও বেশি গ্যাস উত্তোলন করা যাবে।’ চুক্তিতে এ ধারা অন্তর্ভুক্ত করা কোনোভাবেই আমাদের স্বার্থের অনুকূলে নয়। কারণ বেশি উত্তোলন করলে তা আমরা ব্যবহার করতে পারব না এবং আমাদের রফতানিতে সম্মতি দিতে হবে।

আরেকটি বিষয়ও প্রাসঙ্গিক। আমাদের প্রফিট শেয়ারের গ্যাস কোন পয়েন্টে ডেলিভারি দেওয়া হবে? যদি তা উত্তোলনের পয়েন্টে ডেলিভারি দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের পাইপলাইন বানিয়ে তা স্থলে আনতে হবে, যা হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই বাধ্য হয়েই আমরা রফতানিতে সায় দিতে পারি।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, কনোকোর সঙ্গে চুক্তির ফলে চারটি ক্ষেত্রে আমাদের স্বার্থহানি হতে পারে : দরকষাকষির মাধ্যমে প্রফিট শেয়ারে আমাদের কম পাওয়া; কোম্পানির খরচের পরিমাণ বাড়ানো; আমাদের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে গ্যাস রফতানি এবং বেশি হারে গ্যাস উত্তোলন। আমরা নিশ্চিত করে জানি না এসব ক্ষেত্রে কোনো কারসাজি হয়েছে কিংবা ভবিষ্যতে হবে কি-না। তবে ঘর পোড়া গরুর মতো আমরা শঙ্কিত। শঙ্কার পরিমাণ আরও বেড়ে যায় যখন ক্ষুদ্রসংখ্যক ব্যক্তি গোপনে এসব সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এ ছাড়াও অতীতে আমাদের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তিতে দুর্নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এবং অভিযুক্তরা দুর্নীতি করে পারও পেয়ে গিয়েছেন।

পরিশেষে আমরা ব্যথিত হয়েছি দেখে যে, আমাদের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির বিরোধিতাকারীদের গালাগালের আশ্রয় নিয়েছেন। আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, যে ব্যক্তির যুক্তি দুর্বল, সে-ই সাধারণত অশালীন আচরণ করে কিংবা তার কণ্ঠ উঁচু হয়। আর গণতন্ত্রের মূল কথা হলো প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা রক্ষার ‘মূল্য’ দিতে হয় নাগরিকের অতন্দ্রপ্রহরীর ভূমিকার মাধ্যমে। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ, অধ্যাপক এমএম আকাশ, অধ্যাপক রেহেনুমা আহমদ এবং তাদের সহযোগীরা অতন্দ্রপ্রহরীর এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই পালন করেছেন। এ অবদানের জন্য জাতি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।

সূত্র: সমকাল, জুলাই ১, ২০১১

No comments:

Post a Comment